কৃষি বিল-২০২০: একটি অরাজনৈতিক সমীক্ষা

কৃষি বিল-২০২০: একটি অরাজনৈতিক সমীক্ষা
11 Oct 2020, 01:34 PM

কৃষি বিল-২০২০: একটি অরাজনৈতিক সমীক্ষা

ড: গৌতম সরকার

 

জীবনে বহুবার ক্লাস নিতে নিতে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে আফসোস করেছি, " ইস! ভারত যদি চীনের মতো সত্তরের দশকেই আর্থিক সংস্কার নীতি গ্রহণ করতো, তাহলে আজ সব বিষয়ে ওদের থেকে এতটা পিছিয়ে পড়তে হতো না।" একটু পুরোনো পরিসংখ্যান ঘাঁটাঘাঁটি করলে এটা পরিষ্কার হয়ে যাবে - ১৯৮০ পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এই দুই দেশ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলছিল। তারপর যে মুহূর্তে চীন উদার অর্থনীতির সুবিধা পেতে শুরু করল সেই মুহূর্ত থেকেই ভারতকে 'টা-টা বাই বাই' করে বহু আগে এগিয়ে গেল। এই প্রসঙ্গে একটা ছোট্ট হিসেব দিই। ১৯৮০ সালে ভারত আর চীনের স্থূল জাতীয় উৎপাদন ছিল প্রায় সমান ( চীন- $১৯১.১৫ এবং ভারত-$১৮৬.৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার )। ২০১৮ সালে চীনের জাতীয় উৎপাদন ভারতের পাঁচ গুন ছাড়িয়ে গেছে। যদিও ভারতও নব্বই দশকের গোড়া থেকেই আর্থিক সংস্কারের পথে হেঁটেছে, কিন্তু ওই যে 'স্টার্টিং ব্লক' থেকে বেরোতে একটু দেরি হয়ে গেল, ওখানেই চীন আমাদের মেরে বেরিয়ে গেল।

যেকোনও ধরণের পলিসি নিয়ে বাদ-বিরোধ যুগযুগ ধরে চলে আসছে। অনেক সময়ই সেগুলো ভিত্তিহীন পাতি রাজনৈতিক হয়, আবার অনেক সময়ই ক্ষমতায় থাকা সরকার নিজ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্যে করে থাকে। আমরা যারা রাজনীতির গন্ডির বাইরে অবস্থান করি, তারা চেষ্টা করি বিষয়টির ভালো-মন্দ দুটো দিকই সঠিকভাবে পর্যালোচনা করে মতদান করতে। এই নিবন্ধটিতে সেই ধরণের একটি চেষ্টা করা হয়েছে।

১৯৯১ সালে গৃহীত উদারীকরণ নীতিতে শিল্প, দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্কার নীতি গ্রহণ করা হয়েছিলো। তার সুফল আমরা ধীরে ধীরে পেতে শুরু করেছি। জাতীয় এবং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সাথে সাথে বৈদেশিক বাণিজ্যেও ভারত আন্তর্জাতিক বাজারে বিশিষ্ট হয়ে উঠছে। বিদেশী মূলধন আসার পথ সুগম হওয়ায় মূলধন এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত সমস্যা অনেক কমেছে। উৎপাদনে বৈচিত্র্য এসেছে, বেকারত্বের সমস্যার সেভাবে সমাধান না হলেও মানুষের গড় জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটেছে। কিন্তু এই সংস্কার ও পরিবর্তনের মানচিত্রে দেশের একটি ক্ষেত্র উপেক্ষিত থেকে গেছে। এবং সেই ক্ষেত্রটিকে একটি জাতির হৃৎপিন্ড বলা যায়- সেটি হল কৃষি।

ভারতবর্ষ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও কৃষি এখনও সম্পূর্ণভাবে আধুনিক হয়ে উঠতে পারেনি। এখনও অনেক জমিতেই সাবেকি নিয়মে চাষবাস হয় (লাঙল, হাল-বলদ ইত্যাদি), উৎপাদন এখনও অনিশ্চিত এবং ঝুঁকিবহুল (প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা এবং অপ্রতুল জলসেচ ব্যবস্থা), আধুনিক কলাকৌশল ও প্রয়োজনীয় কৃষি ঋণের অভাব ইত্যাদি কারণে উৎপাদন, সংগ্রহীকরণ, গুদামজাতকরণ এবং বিপণন কোনও ব্যাপারেই পেশাদার হতে পারেনি। ১৯৯১-র সংস্কার আইনে ভরসা করে কৃষিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যেটি ২০২০ সালের নয়া কৃষি বিলে করার চেষ্টা হয়েছে।

 

এবার আমরা একঝলকে কৃষিবিল সংক্রান্ত পরিবর্তনগুলো দেখে নিই। এই বিলে মূলতঃ তিনটি আইনের উল্লেখ আছে:

১. কৃষিপণ্য বাণিজ্য ও লেনদেন উন্নয়ন সংক্রান্ত আইন।

২. কৃষিপণ্যের দাম নিশ্চিতকরণ, কৃষক সুরক্ষা এবং ক্ষমতায়ন চুক্তি এবং

৩. অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন।

২০০৩ সালে গৃহীত কেন্দ্রীয় সরকারের এপিএমসি ( এগ্রিকালচারাল প্রোডিউস মার্কেট কমিটি) আইনে রাজ্যগুলিকে কৃষি পণ্য বিপণনের জন্য বাজারভিত্তিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছিল। এই আইনের ফলশ্রুতিতে সব রাজ্যেই কিষান মান্ডি গড়ে ওঠে। কৃষক তার ফসল  মাণ্ডিতে সরকার নির্ধারিত 'সহায়ক মূল্যে' বিক্রি করত। এর ফলে কৃষকেরা ফড়েদের হাত থেকে অনেকটা নিষ্কৃতি পেয়েছিল। রাজ্য সরকারের তত্ত্বাবধানে এই মাণ্ডিতে শস্য জমা থাকত। পরে বাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী এই ফসল সরবরাহ হত। অর্থাৎ সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করত। রাজ্য সরকার এই কৃষি বাজারের ওপর বিভিন্ন ধরণের কর ও সেস বসিয়ে অর্থ উপার্জন করত। নতুন আইনে রাজ্যের এই ক্ষমতা খর্ব হয়েছে। কারণ কৃষকরা আর ফসল বিক্রয়ের ক্ষেত্রে মাণ্ডির দ্বারস্থ হতে বাধ্য থাকবে না। রাজ্য সরকার কেবলমাত্র মাণ্ডিতে আসা ফসলের ওপরই কর আরোপের অধিকারী, খোলা বাজারে লেনদেনের ওপর নয়। এখানেই রাজ্যগুলির চরম আপত্তি। তাদের বক্তব্য,  সংবিধানের যৌথ তালিকায় থাকা সত্ত্বেও নতুন বিলে কেন্দ্রীয় সরকার কৃষির ওপর রাজ্যের ক্ষমতা খর্ব করে নিজেদের আধিপত্য বাড়িয়েছে।

একটা হিসাব দাখিল করলে ব্যাপারটি অনেকটা স্পষ্ট হবে। এই মুহূর্তে সারা দেশে ৬৯০০ টি মাণ্ডি আছে। ২০১৬ সাল থেকে এই মাণ্ডিগুলি 'ই-নাম' ( কৃষি বৈদ্যুতিন বাজার) ব্যবহার করে পণ্য লেনদেন করা শুরু করেছে। ২০১৮-১৯ সালের হিসেবে কেবলমাত্র উত্তপ্রদেশের ৭৫টি জেলার ২৫১টি মাণ্ডিতে প্রায় ৬৭ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছে। কর ও শেষ বাবদ উত্তরপ্রদেশ সরকারের আয়ের পরিমান ছিল ১,৮২৩ কোটি টাকার মতো। স্বাভাবিকভাবেই অনেকের মতে নয়া কৃষি বিল রাজ্য সরকারগুলির আয়ের অন্যতম উৎসে বড়সড় কোপ বসিয়েছে।

কেন্দ্রের বক্তব্য, মান্ডিগুলি সময়ের সাথে সাথে স্থানীয় রাজনীতি পুষ্ট হয়ে ক্ষমতাশালী হয়ে উঠছিল, এবং সবসময় কৃষকদের স্বার্থ অনুযায়ী কাজ করছিল না। কৃষক এবং কৃষি বিপণন ব্যবস্থাকে মাণ্ডির ক্ষুদ্র গন্ডি থেকে মুক্তি দেওয়াই এই আইনের উদ্দেশ্য। কৃষিপণ্য বিক্রয় এবং চলাচলের ওপর রাজ্য সরকারের কোনও বিধিনিষেধ না থাকায় একজন চাষি বাজার অর্থনীতির সুযোগ নিয়ে তার ইচ্ছেমতো ফসল বিক্রি করতে পারবে। ইচ্ছে হলে অন্য রাজ্যেও সে তার পণ্য রপ্তানি করতে পারে। এর ফলে উদ্বৃত্ত শস্যবিশিষ্ট রাজ্যগুলির চাষিরা ভালো দাম পাবে এবং ঘাটতি শস্যের রাজ্যগুলির ক্রেতারা ন্যায্য দামে বাজার থেকে ফসল কিনতে পারবে। কিন্তু একটা জিজ্ঞাসা রয়েই গেল, 'চুক্তি চাষ' ব্যবস্থায় নতুন আইনে দাম কিভাবে নির্ধারিত হবে! সেই বিষয়টি বোঝার জন্য দ্বিতীয় আইনটি একটু বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

 

দ্বিতীয় আইনে চুক্তি চাষের কথা বলা হয়েছে, কিভাবে একজন কৃষক এবং ক্রেতার মধ্যে চুক্তি হবে তার রূপরেখা সংক্রান্ত আইন। চাষ শুরুর আগেই ফসলের দাম, সরবরাহ ব্যবস্থা, গুণগত মান ইত্যাদি সম্পর্কিত কথা লেখা থাকবে। কিন্তু চুক্তির ভিত্তিটি কি হবে, অর্থাৎ কোন পদ্ধতি অবলম্বনে উক্ত বিষয়গুলি নির্ধারিত হবে সেই সংক্রান্ত নিয়মাবলী পরিস্কার করে বলা নেই। এখানেই প্রশ্ন উঠছে কৃষক ও ব্যবসায়ী, অসম দুই গোষ্ঠীর চুক্তিতে কৃষকদের স্বার্থ সঠিকভাবে সংরক্ষিত হবে তো? যদি চুক্তি লঙ্ঘিত হয়, একজন দরিদ্র কৃষকের (মোট কৃষকের ৮৫ শতাংশ) পক্ষে আইনি সাহায্য নিয়ে নিজের পাওনাগন্ডা বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা ও অর্থ কি সত্যিই আছে! আমাদের দেশের বেশিরভাগ কৃষকই প্রান্তিক (গড় কৃষি জমির আয়তন ১.০৮ হেক্টর), আশঙ্কা করা হচ্ছে নয়া কৃষিবিলের সৌজন্যে আবার সাবেক সামন্ত ব্যবস্থা ফিরত না আসে, যেখানে দেনার দায়ে কৃষকের স্থাবর-অস্থাবর সব কিছুই জমিদারের করাল গ্রাসে ভ্যানিশ হয়ে যেত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিভিন্ন মাধ্যমে সরকারের দিক থেকে কৃষকদের স্বার্থের দিকটা গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা জোরের সঙ্গে বললেও আইনে স্পষ্ট করে কিছু উল্লেখ না থাকার জন্যে কৃষকেরা পশ্চিমাকাশে সিঁদুরে মেঘ দেখে বিপন্ন বোধ করছে।

 তিন নম্বর আইন সংস্কারের দ্বারা সরকার কতিপয় নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যকে 'অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যের তালিকা' থেকে বাদ দিয়েছে। দ্রব্যগুলি হলো- চাল, ডাল, তৈলবীজ, পেয়াঁজ, আলু, ইত্যাদি। অর্থাৎ আইন মোতাবেক এই সমস্ত দ্রব্যের উৎপাদন, সংরক্ষণ, এবং বিপণনের ওপর সব সরকারি নিয়ন্ত্রণ উঠে গেল। এই সমস্ত শস্যের আপাতকালীন বন্টন এবং যোগানের ওপর রাজ্য সরকারগুলোর যে নিয়ন্ত্রণ ছিল তা তুলে দেওয়া হলো এবং পুরোপুরি বাজার অর্থনীতির ওপর ছেড়ে দেওয়া হলো। যেটুকু ক্ষমতা ধরে রাখা হলো সেটাও জরুরি পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকার আরোপ করতে পারবে। জরুরি অবস্থাটা হলো- যদি খোলা বাজারে পচনশীল দ্রব্যের দাম পঞ্চাশ শতাংশ এবং অন্যান্য কৃষিজাত দ্রব্যের দাম একশো শতাংশ বাড়ে তবেই কেন্দ্র সরকার সেই বাজারে হস্তক্ষেপ করবে। একদিকে বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যদিকে বাজার থেকে প্রাপ্য রাজস্ব খুইয়ে স্বাভাবিকভাবেই বেশিরভাগ রাজ্যসরকার কেন্দ্রের এই নীতির বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। বিশেষ করে পাঞ্জাব এবং হরিয়ানায় বেশ কয়েকদিন ধরে বিক্ষোভ, ধর্ণা, প্রতিবাদ মিছিলের মধ্যে দিয়ে নয়া কৃষিবিলের বিরুদ্ধে জেহাদ প্রদর্শন চলছে৷

অন্যদিকে সরকার পক্ষ এই কৃষিবিলকে একটা মাইলফলক হিসাবে দেখছেন। তাঁদের দাবি ১৯৯০-৯১ সালের সংস্কার ছিল মূলত শিল্প ও বাণিজ্য অভিমুখী। সেই উদারীকরণ নীতি দেশের শিল্পকে লাইসেন্সরাজ থেকে মুক্ত করে শিল্পায়ন ও বাণিজ্যকরণে নতুন দিশা দেখিয়েছিল। আর ২০২০- র কৃষিনীতি কৃষকদের মুক্ত বাণিজ্যের সন্ধান দিয়ে আর্থিকভাবে দেশের কৃষক সম্প্রদায়কে স্বাবলম্বী করার বার্তা বহন করছে। নীতি আয়োগের শীর্ষকর্তা অমিতাভ কান্তের মতে, " ১৯৯১-র সংস্কার ভারতের শিল্পের রথের চাকা গড়িয়ে দিলেও কৃষি বঞ্চিতই থেকে গিয়েছে। উল্টে কৃষি বিপণন ব্যবস্থায় মাণ্ডির ভূমিকা কৃষকের গলায় ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংস্কার যেভাবে ১৯৯১ সালে শিল্পকে মুক্তি দিয়েছিল, একইভাবে কৃষিকে মুক্তি দেবে।"

 

রাজনৈতিক দামামা থেকে সরে এসে শুধু কৃষকদের কথা বললে, নয়া নীতি নিয়ে তাদের সমস্যা মূলতঃ দুটি- এক, 'ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ব্যবস্থা'র লোপ আর 'চুক্তি ভঙ্গে আইনি সাহায্যে'র অস্পষ্টতা। সহায়ক মূল্য প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী নরেন্দ্র সিং টোমার বলেছেন, "এই বিলে সহায়ক মূল্য উল্লেখের কোনও জায়গা নেই। কারণ এই বিলের উদ্দেশ্য হল কৃষকদের স্বাধীনভাবে উৎপাদন এবং বিপণন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সুযোগ করে দেওয়া এবং স্থানীয় মাণ্ডিগুলির একচেটিয়া আধিপত্য খর্ব করা।" যদিও নীতির এই দিকটার সাফল্য ভবিষ্যৎ বিচার করবে। এই মুহূর্তে যাদের সুযোগটা দেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে গরীব এবং প্রান্তিক চাষিরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে রীতিমতো শঙ্কিত। চুক্তি চাষের আইনি স্বার্থে বলা হয়েছে- কৃষি সংক্রান্ত চুক্তিপত্র একটি 'কনসিলেশন বোর্ডের ' কাছে থাকবে। চুক্তি ভঙ্গ হলে সেই বোর্ডের কাছে নালিশ করা যাবে। সমস্যা ৩০ দিনের মধ্যে না মিটলে সংশ্লিষ্ট পার্টি মহকুমা আদালতে আপিল করতে পারবে। মহকুমা আদালতের সিদ্ধান্তে খুশি না হলে ওই ব্যক্তি ‘অ্যাপেলেট অথরিটি’র ( যার সভাপতি হলেন কালেক্টর বা অ্যাডিশনাল কালেক্টর) কাছে আবেদন পৌঁছে দিতে পারবে। মহকুমা শাসক বা অ্যাপেলেট অথরিটিও আইনি সমাধানের জন্য ৩০দিন সময় পাবেন। এছাড়া দোষী পার্টিকে জরিমানা করার ক্ষমতাও এদের হাতে দেওয়া হয়েছে।

সমস্যার জায়গাটি অন্যত্র বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীর কথায়- অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যদ্রব্যের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়ার ফলে ব্যবসায়ীরা ফসল ওঠার সময় বাজার থেকে কম দামে শস্য কিনে মজুত করে রাখবে, এবং বাজারে কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি করে ওই সমস্ত দ্রব্যের যথেষ্ট দাম বাড়িয়ে মুনাফা লাভ করবে। এতদিন এই সমস্যা সামাল দিত সরকারি শস্যাগার, যেটি মাণ্ডি ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে তৈরি হতো। এছাড়া বৃহৎ পুঁজিপতি এবং বিদেশি বিনিয়োগ ভারতীয় কৃষিতে অংশগ্রহণ করলে, কৃষকদের ভবিষ্যৎ কি হবে তা নিয়ে একটা আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

যদিও কেন্দ্রীয় সরকার এই সবকিছুর মধ্যে ভারতীয় কৃষি তথা কৃষকদের প্রভূত উন্নয়নের রুপোলি সংকেত লক্ষ্য করছে। একটা সময় 'শিশু শিল্প সংরক্ষণ নীতি' তুলে দেওয়া নিয়েও প্রচুর বাক-বিতণ্ডা হয়েছে। পরবর্তীতে আমাদের শিল্প কোনোরকম সরকারি সাহায্য ছাড়াই ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে। সেই একই পথে সময়ের সরণি বয়ে কৃষিও স্বাবলম্বী হবে - এই বিশ্বাসের ফসলই হল, কৃষিনীতি ২০২০। নয়া কৃষিনীতির রাস্তা ধরে ভারতীয় কৃষিকে লাভজনক ক্ষেত্রে উন্নীত করতে সরকারের পক্ষ থেকে কতকগুলি ব্যবস্থাগ্রহণ খুব জরুরি। এক, কৃষি গবেষণার সার্বিক উন্নতি ঘটিয়ে 'বেস্ট ইন ক্লাস' টেকনোলজি গড়ে তুলতে হবে যার সাহায্যে কৃষকদের আয় বেশ কয়েকগুণ বাড়ানো যাবে। দুই, এতদিন মাণ্ডিতে কাজ করা কমিশন এজেন্টদের কৃষি সংক্রান্ত  ‘ভ্যালু-অ্যাডেড সার্ভিস', যেমন- শস্যের গুণমান বাছাই, গুদামজাতকরণ, হিমঘরে সংরক্ষণ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ইত্যাদি কাজে নিয়োজিত করতে হবে। তিন, মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা, জল সংরক্ষণ, পর্যাপ্ত জলসেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষির উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে হবে। এবং সর্বোপরি, সব্জি এবং ফল উৎপাদনের পরিবেশগত সুবিধা নিয়ে ভারতকে একটি উন্নত ‘খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে' পরিণত হতে হবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে যথেষ্ট বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হবে। এই সমস্ত ব্যাপারে সরকারের সঠিক যোগদান যে খুব গুরুত্বপূর্ণ তা আলোচনার অপেক্ষা রাখে না।

যেকোনও ধরণের পরিবর্তন সূচনায় বিভিন্ন বিতর্ক ডেকে আনবে সেটা খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু বিতর্ক সবসময় স্বাস্থ্যকর হওয়া কাম্য। আমাদের মতো দেশে একাধিক রাজনৈতিক দর্শনের চাপান-উতোরে সব আলোচনাই (সামাজিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক) রাজনীতির রঙ মেখে আসল বক্তব্য হারিয়ে আপামর মানুষকে বিভ্রান্ত করে। যেকোনও নীতির অদূর এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিচার করার পরই সেব্যাপারে সঠিক বিশ্লেষণ সম্ভব। আর তার জন্যে দরকার পারস্পরিক বিশ্বাস এবং ঐক্যমত। সর্বোপরি প্রয়োজন অপেক্ষা করার মতো ধৈর্য্য। যেকোনও ব্যবস্থা ভালো না মন্দ সেটা বিচার করার জন্যে সেই ব্যবস্থাকে নিজের শর্তে কিছুদিন কাজ করতে দেওয়া বাঞ্ছনীয়।

                             ............xxx.............

 

ছবি: সংগৃহীত     

তথ্যঋণ: বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা এবং ইন্টারনেট

লেখক: অর্থনীতির শিক্ষক, যোগমায়া দেবী কলেজ, কলকাতা

যোগাযোগ:-ফোন: ৯৮৩৬৩-৩৯৬৯৩

ই-মেল: [email protected]

 

Mailing List