৬৯ বছর পর বিধানসভায় ‘শূন্য’ পেল বাম-কংগ্রেস, তবে কী বঙ্গ রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিকতা হারানোর পথে

৬৯ বছর পর বিধানসভায় ‘শূন্য’ পেল বাম-কংগ্রেস, তবে কী বঙ্গ রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিকতা হারানোর পথে
03 May 2021, 07:54 PM

৬৯ বছর পর বিধানসভায় ‘শূন্য’ পেল বাম-কংগ্রেস, তবে কী বঙ্গ রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিকতা হারানোর পথে

 

সুমন ঘোষ

 

১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীন দেশের সব কিছু গুছিয়ে উঠতে কিছুটা তো সময় লাগেই। তারপর শুরু হয় বঙ্গ বিধানসভাও। যে বিধানসভার প্রথম নির্বাচন হয় ১৯৫২ সালে। সেই সময় তো কংগ্রেসের রমরমা। কিন্তু বামপন্থীরাও অংশ নেননি এমন নয়। অংশ নিয়েছিলেন। এবং একাধিক আসনও পেয়েছিলেন। এমন কোনও বছর যায়নি যে কোনও জনপ্রতিনিধি পাঠাতে পারেনি কংগ্রেস বা বামপন্থীরা। ৬৯ বছর পর তেমনই এক বিধানসভা নির্বাচনের সাক্ষী থাকল রাজ্য তথা দেশ। যেখানে বিধানসভায় একজন প্রতিনিধিও পাঠাতে পারল না সিপিএম বা কংগ্রেস।  

 

অথচ, এই দুটি দল দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছে পশ্চিমবঙ্গে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাজ্যের ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস। আর সিপিএমের ৩৪ বছরের রাজ্য শাসনের কথা বর্তমান প্রজন্মের কাছে অজানা নয়। ২০১১ সালে যার শেষ হয়। ক্ষমতায় আসে তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর থেকেই শুরু হয় ভাঙন। ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকা একটি দল ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ২৬টি আসন পেয়ে বিরোধী দলের মর্যাদাও হারায়।  ৪৪টি আসন পেয়ে বিরোধী দলের শিরোপা যায় কংগ্রেসের হাতে। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনেও সিপিএম কোনও আসন পায়নি। তবে কংগ্রেস নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে সমর্থ্য হয়েছিল। আর ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এসে দেখা গেল - দুই দলই ‘শূন্য’! তৈরি হল নতুন ইতিহাস।

 

১৯৫২ সালে বিধানসভায় ২৩৮টি আসন ছিল। কংগ্রেস ২৩৬টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ১৪৯টি আসনে জয়লাভ করে। তখনও সিপিএমের জন্ম হয়নি। সিপিআই ৮৬ আসনে প্রার্থী দিয়ে ২৮ আসন পেয়েছিল। ১৯৫৭ সালে আসন বেড়ে হয় ২৫২টি। কংগ্রেস পেয়েছিল ১৫২টি। আর সিপিআই পায় ৪৬ আসন। ১৯৬২ সালে কংগ্রেস ১৫৭ আসন পায় কংগ্রেস। সিপিআই পেয়েছিল ৫০টি। তারপর সিপিআই ভেঙে সিপিএমের জন্ম।

 

১৯৬৭ সালে বিধানসভার আসন বেড়ে হয় ২৮০টি। নির্বাচনে কংগ্রেস ১২৭টি আসন পায়।  সিপিআই পায় ১৬টি আর সিপিএম পায় ৪৩টি আসন।  ৬৭ সালের পর দু’বছরের মধ্যে নির্বাচন হয় ১৯৬৯ সালে। কংগ্রেসের আসন কমে হয় ৫৫টি, সিপিআই ৩০ এবং সিপিএম ৮০টি আসন পায়। আবার দু’বছর পর নির্বাচন হয় ১৯৭১ সালে। ১৯৭১ সালে কংগ্রেস আসন বাড়িয়ে ১০৫ টি আসন পায়। সিপিআই ১৩ ও সিপিএম সবার থেকে বেশি আসন পায়। সিপিএমের আসন ছিল ১১৩টি। ঠিক তার পরের বছরই অর্থাৎ ১৯৭২ সালে ফের নির্বাচন হয়। কারণ, এই কয়েক বছরে জোট জটিলতায় বারবার ভোট করতে হয়। কারণ, জোট গড়ে যেমন সরকার তৈরি হয়েছিল, তেমনই ভাঙতেও সময় নেয়নি।

 

১৯৭২ সালের নির্বাচনে ফের বিপুল সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফেরে কংগ্রেস। কংগ্রেসের আসন সংখ্যা ছিল ২১৬। সিপিআই ৩৫ ও সিপিএম ১৪টি আসন পায়। ফলে পাঁচ বছর টানা সরকার চালাতে সক্ষম হন সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়।

 

এরপরই কংগ্রেস জমানার অবসান। পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে বামপন্থীরা ক্ষমতায় আসে ১৯৭৭ সালে। তারপর থেকে একটানা ৩৪ বছর। যার অবসান হয় ২০১১ সালে। তারপর দশ বছর ক্ষমতায় তৃণমূল। এবারও তৃতীয়বারের জন্য তৃণমূল ক্ষমতায় ফিরেছে। কিন্তু হারিয়ে গিয়েছে দীর্ঘদিন রাজ্যের ক্ষমতায় থাকা দু’টি প্রধান দল। দু’টি দলের ভাগ্যে একটি আসনও জোটেনি। তার জায়গায় ৭৭টি আসন পেয়ে বিরোধী দলের মর্যাদা পেয়ে গেল বিজেপি।

 

দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের সাক্ষী থাকা দু’টি দলের বর্তমান অবস্থা ইতিহাস বৈকি। বিধানসভার ইতিহাসে নিশ্চয় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করবে। তার প্রধান কারণ, শুধু দু’দলের শূন্য পাওয়া নাকি ইন্ডিয়ান সেকিউলার ফ্রন্টের নেতা আব্বাস সিদ্দিকীর সঙ্গে জোট। নাকি্ মেরুকরণের ভোট। নাকি সচেতন ভোটার বিজেপি রুখতে মানুষের জোট গড়েছিল। এমন অনেক প্রশ্ন। উত্তরও নিশ্চয় ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসবে।

Mailing List