আফগান সিন্ড্রোম: কিভাবে প্রভাবিত ভারত এবং বিশ্ব?

আফগান সিন্ড্রোম: কিভাবে প্রভাবিত ভারত এবং বিশ্ব?
22 Aug 2021, 12:42 PM

আফগান সিন্ড্রোম: কিভাবে প্রভাবিত ভারত এবং বিশ্ব?

 

ডঃ রাজ কুমার কোঠারী

 

আফগানিস্তানের ইতিহাস দীর্ণ হয়েছে কয়েক দশকের টানা যুদ্ধ এবং সংঘাতের ফলে। যার শিকার হয়েছে লক্ষ লক্ষ হতভাগ্য মানুষ। যারা জীবন দিয়েছে, বাস্তুচ্যুত হয়েছে। দারিদ্র্য, অনাহারের সাথে যুঝতে যুঝতে ক্রমশই আরও অনিশ্চিত জীবনের মধ্যে এসে পড়েছে। দেশটি ভূ প্রকৃতিও নির্দয়। শুষ্ক পাহাড়ি এলাকা যেখানে কৃষির সুযোগ নেই বললেই চলে। এর সাথে খরা, বন্যা, ভূমিকম্প এবং কঠোর শীত যাবতীয় প্রাকৃতিক সমস্যায় মানুষগুলি জর্জরিত।

 

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্ক শহরে যে আত্মঘাতী বিমান হামলা ঘটে তার প্রধান চক্রী ওসামা বিন লাদেন তথা আল কায়েদার নেতৃবর্গ তালিবানের আশ্রয়ে থাকার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটোর যৌথ বাহিনী এবং আফগানিস্তানের কিছু আঞ্চলিক গোষ্ঠী একজোট হয়ে সামরিক অভিযান চালায় এবং ২০০১ সালের নভেম্বরে তালিবানদের ক্ষমতাচ্যুত করে। এই ঘটনা সর্বজন বিদিত। পরবর্তী দুই দশক এই অঞ্চলে পশ্চিমী শক্তির নিয়মিত উপস্থিতি, আফগান সরকারী বাহিনীকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সমর্থন এবং প্রশিক্ষণ দেওয়া সত্ত্বেও, কোন অন্তরালে তালিবানরা নিজেদের হৃতশক্তি পুনরুদ্ধার করে আবার সাড়ম্বরে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং গত কয়েক মাস ধরে ধাপে ধাপে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকেই নিজেদের অধিকারে এনেছে। আর গত সপ্তাহে আমরা দেখলাম যে তারা রাজধানী কাবুলও দখল করল। প্রায় অপ্রত্যাশিত এই ঘটনায় বিমূঢ় বিভিন্ন দেশ দুই দশক ধরে আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে যেসব গঠনমূলক কর্মকান্ডে ব্যস্ত ছিল সেসব অসমপূর্ণ রেখে, বিপুল বিনিয়োগকে পেছনে ফেলে তড়িঘড়ি তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট নৈরাজ্য বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষ ও কূটনৈতিকদের স্তম্ভিত করেছে।

আফগানিস্তানের এই ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবে সেটা বলাই বাহুল্য। বিশেষ করে পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক এবং সীমান্ত বিরোধএর প্রেক্ষাপটে ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে। কারণ এই দুই দেশের সাথেই আফগানিস্তান এর ভবিষ্যত কর্তৃপক্ষের সুসম্পর্ক। প্রথমত পাকিস্তানের সাথে আফগানিস্তানের সীমানা দুর্ভেদ্য নয়। এই পথে আইনি এবং বেআইনি দুই পথেই আদান প্রদানের ইতিহাস রয়েছে। সে পাকিস্তানী উগ্রপন্থাই হোক বা আফগান শরণার্থীর প্রবেশ। পাকিস্তান চিরকালই তার এই উত্তর দিকের প্রতিবেশীর ব্যাপারে রাজনৈতিক কারণে আগ্রহী। ইদানিং চীন আফগানিস্তানের ব্যাপারে গুরুত্ব দিচ্ছে। সম্প্রতি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের সাথে সিনিয়র তালিবান নেতাদের বৈঠক যথেষ্ট  ইঙ্গিতবহ সন্দেহ নেই। ফলে নতুন সময় ভারতের জন্য কি চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসবে সেটা দেখার।  

 

চীনের সাথে আফগানিস্তানের এই নতুন সম্পর্কের নিরিখে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল বৃহস্পতিবার গভীর রাতে চীনের জাতীয় সম্প্রচারকারী সিজিটিএনকে তালিবান দের পক্ষ থেকে সুহেল শাহীন এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আফগানিস্তানের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনে চীন গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে যে বর্তমান তালিবানরা তাদের পূর্বসূরীদের (1996-2001) চেয়ে অনেক বেশি যুক্তিবাদী এবং স্পষ্টবাদী।

 

এই সম্ভাব্য জিও পলিটিক্যাল পুনর্গঠন অনেক পুরোনো হিসেবকেই উল্টে পাল্টে দেবে। বর্তমান পরিস্থিতির নিরিখে মার্কিন সামরিক বাহিনীর এক প্রাক্তন প্রধান প্রেসিডেন্ট বাইডেনের মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেন নি। বিবিসি রেডিও 4-এ অ্যাডমিরাল মাইক মুলেন বলেন সৈন্য প্রত্যাহারের আগে সহযোগী দেশগুলির সঙ্গে সঠিক ভাবে পরামর্শ করতে বাইডেন ব্যর্থ হয়েছেন। অ্যাডমিরাল মুলেন প্রেসিডেন্ট ওবামার সময়ে আফগানিস্তানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। তিনি মনে করেন বিগত ২০ বছর আফগানিস্তানে এই মার্কিন অভিযান একটি ভ্রান্ত মিশন। যদিও আল-কায়েদা প্রশিক্ষণ শিবিরগুলির মোকাবিলা করার মত ছোটখাট সাফল্য অবশ্যই ছিল।

 

এবার আমার উপস্থাপনার দ্বিতীয় অংশে আসছি। তালিবানরা সাংস্কৃতিকভাবে সমধর্মী বা হোমোজেনাস গোষ্ঠী। যারা  কিছু নির্দিষ্ট ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাস করে। তারা উদারগণতান্ত্রিক দেশ গুলির রাজনৈতিক তথা আইনি  কাঠামোর চেয়ে শরিয়তী ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে। পবিত্র কোরান শরীফ তথা প্রফেট মহম্মদ নির্দেশিত পরম্পরার উপর ভিত্তি করে ইসলামী আইন ব্যবস্থা তারা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যেখানে আইন ভঙ্গের জন্য প্রতিশোধমূলক শাস্তির বা রিট্রিবিউটিভ পরম্পরা বিদ্যমান। এই ধরনের আইনি ব্যবস্থা আদৌ বর্তমান সময়ের উপযোগী কিনা তা সাবেকি এবং সংস্কারপন্থী মুসলিম দের মধ্যে বিতর্কের বিষয়। তবে সামগ্রিকভাবে এই জাতীয় ব্যবস্থা  পশ্চিম আধুনিকতার বিরোধী থিসিস (anti-thesis) হিসাবে বিবেচিত হতে পারে তা নিয়ে দ্বিমত নেই। বস্তুত পশ্চিমী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিজস্ব শৈলী এবং আইনের অনুশাসনের উপর ভিত্তি করে শাসনতন্ত্র রচনা করেছে। এই প্রসঙ্গ সংশ্লিষ্ট দুটি আখ্যানের মধ্যে একটি অবিরাম বিতর্ক তৈরি করেছে।

 

 আফগানিস্তানে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দায় নিয়ে প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক। বিশেষ করে যখন দেখা যাচ্ছে যে তালিবানরা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে একের পর এক অঞ্চল দখল করছে, তখন কোন বিচারে মার্কিন সরকার আফগানিস্তান থেকে তার সৈন্য প্রত্যাহার করেছে? প্রশ্ন হতেই পারে যে আশরফ গনির সরকারের আকস্মিক পতনের পিছনে কি কিছু গোপন কারণ ছিল? রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে এই বিষয়টি খুব ভালভাবে প্রত্যক্ষ করেও কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নীরব দর্শক হয়ে রইল? কেন আশরফ গনি হঠাৎ কাবুল থেকে পালিয়ে গেলেন গোটা দেশকে নৈরাজ্যের মধ্যে ফেলে দিয়ে?

 

বর্তমান পরিস্থিতির নিরিখে ভারতের পক্ষে কোন নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন। এই নৈরাজ্য তথা বিশৃঙ্খলা থেকে কোন স্পষ্ট রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সম্ভাবনা জানতে আরও কিছু সময় লাগবে। অতএব, নিকট ভবিষ্যতে আফগানিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভারতকে অত্যন্ত সংযম এবং ধৈর্য দেখাতে হবে। এই পরিস্থিতে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে সমস্ত ভারতীয় নাগরিককে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা। একেবারেই কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনাও করা উচিত নয়। বরং আফগানিস্তানে শান্তি ও স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনার জন্য বহুপাক্ষিক প্রচেষ্টার উদ্যোগের কথা ভাবা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক যৌথবধদ্ধতার প্রসঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ এই বিষয়ে হয়ত অংশগ্রহণ করতে অসুবিধের সম্মুখীন হতে পারে। কারণ নিরাপত্তা পরিষদের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য পাঁচটি স্থায়ী সদস্যের বাধ্যতামূলক সম্মতির প্রয়োজন হয়। যা আফগানিস্তানের ব্যাপারে অসম্ভব বলেই মনে হয়। কারণ চীন, যে নিজেই নিরাপত্তা পরিষদের একজন স্থায়ী সদস্য হওয়া সত্বেও যৌথবদ্ধ সহযোগিতার কথা না ভেবে ইতিমধ্যেই তালিবানদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেছে। চীনের ঘনিষ্ট পাকিস্তানও সরাসরি তালিবানদের এই বিজয়কে সাধুবাদ জানিয়েছে।  ভারতের এই প্রতিবেশী রাষ্ট্রদুটি ঘোলা জলে মাছ ধরতে গিয়ে অবশ্যই নিজেদের অনুকূলে মাইলেজ পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে যা ভারতের পক্ষে অসুবিধার সৃষ্টি করতে পারে। এই পরিপ্রেক্ষিতে, নয়া দিল্লির উচিত হবে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা এবং সেই অনুযায়ী সুচিন্তিত নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া। নিঃসন্দেহেই এই পরিস্থিতি ভারতের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারকদের জন্য একটি অ্যাসিড পরীক্ষা।

 

লেখক: রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক, ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ।

 

ads

Mailing List