আবাহন / গল্প

আবাহন / গল্প
28 Nov 2021, 01:00 PM

আবাহন

 

ড. গৌতম সরকার

 

   

লকডাউনের ছমাসের মাথায় নিতাইয়ের বউ পালালো। আর ছোট্ট মফঃস্বল শহরে ঘরবন্ধ জীবনে এটা বেশ একটা খবর হয়ে অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াতে লাগল। অন্যসময় হলে কাজকর্মের চক্রগতিতে ব্যাপারটা সেভাবে তোলপাড় ফেলত না। কিন্তু ওই যে কথায় বলে না, 'অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা'।

তাই এলাকার নিষ্কাম মানুষগুলোর কাছে মালতির ঘর ছাড়াটা বেশ শেষ পাতে চাটনির মত উপাদেয় হয়ে উঠল।

নিতাই অবশ্য বউকে দোষ দেয় না, সত্যিই তো মরদ মানুষ যদি বউয়ের মুখে দুবেলা দুমুঠো খাবারের যোগান দিতে না পারে, শখ আহ্লাদ মেটাতে না পারে সেই মরদের কিছু বলা সাজে না। মার্চ মাসে যখন লকডাউন শুরু হল তখন জনমানবশূন্য এই শহর খাঁ খাঁ করত, তখন কে আর রিকশা চড়বে! মালতী যে দুবাড়ি ঠিকে কাজ করত তাও করোনার কারণে চলে গেল। ঘরে যা ছিল কোনোরকমে দুমাস চলার পর আর এককণাও খাবারের সংস্থান রইল না। তারপর ধারদেনা, মালতীর হাতের দুগাছা চুড়ি বিক্রি এইসব করে আরও কয়েকটা মাস চলল। মাঝে একবার লকডাউন উঠলেও মানুষজন ঘর থেকে বেরোলো না। দিনভর রিকশা নিয়ে কদমতলার মোড়ে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকত, কোনোদিন একটা-দুটো সওয়ারি জুটত, কোনোদিন তাও জুটত না। বিকেলের পর গোটা এলাকা শ্মশানের চেহারা নিত, তিনটের পরই দোকানপাট বন্ধ করে লোকজন যে যার ঘরে গিয়ে সেঁধোতো। বিকেল ফুরিয়ে সন্ধ্যার মুখে নির্জন জায়গাটায় দাঁড়িয়ে থাকতেও ভয় লাগত। মালতির মুখনাড়া খেয়ে মাঝে মাঝে পুলিশের নজর এড়িয়ে রিকশা নিয়ে বেরোতে হয়েছে, উদ্দেশ্যহীন ভাবে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছে, কিন্তু সওয়ারীর দেখা মেলেনি। সকালবেলা বেরিয়ে প্রয়োজনটুকু মিটিয়ে সবাই ঘরের নিরাপদ আশ্রয়ে ঢুকে পড়ে। নিতাই এখন বোঝে, মালতি ওই সময় মনের মানুষের সাথে সময় কাটাবে বলে নিতাইকে ঘরের বাইরে বের করে দিত।

  রাগ নিতাইয়ের নেই, তবে আক্ষেপ আছে। চার বছরের পুরনো বউ, একটা অভ্যেস তো হয়ে গিয়েছিল। তাকে ভালোবাসতো না সেটাও বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না। কুলতলির সেই রথের মেলায় প্রথম দেখা, তারপর একটু প্রেম ভালোবাসা হল। নিতাইয়ের মা তখন বেঁচে, তাই দুবাড়ির মত পেতে কোনো অসুবিধা হয়নি। বেশ ছিল দুজনে, তখন আয়পয়ও ছিল, মাও ঘরের পাশে দুটো আনাজ ফলিয়ে, হাঁস-মুরগির ডিম বেচে সংসারের জন্য দু-চার পয়সা আনত। মালতিকে কাজ করতে বাইরে বেরোতে হয়নি। মা মারা যাওয়ার পর সব কেমন ছন্নছাড়া হয়ে গেল। নতুন বউয়ের খোলস ছেড়ে মালতি মুখরা হয়ে উঠল, সর্বক্ষণ মেজাজ টঙ হয়ে থাকত। মুখে সবসময় ‘এই নেই সেই নেই’। সারাদিন খাটাখাটুনির পর বাড়ি ফিরে সবসময় ক্যাচাকেচি ভালো লাগতো না, দুকথা হতে হতে মাঝেমধ্যেই চরম হয়ে উঠত, দুয়েকবার গায়েও হাত তুলে ফেলেছে।

    

দুদিন ঘর থেকে বেরোয়নি নিতাই। খালি মনে হয়েছে রাস্তায় বেরোলেই সবাই ওর দিকে তাকিয়ে থাকবে, মুচকি হাসবে। বাতাসে কিছু আপত্তিকর মন্তব্যও ছুঁড়ে দিতে পারে। আসলে বউ পালিয়ে যাওয়াটা তো কোনো সম্মানের ব্যাপার নয়। তবে আজ বেরোতে হবে। কাঁহাতক ঘরে বসে হা-হুতাশ করা যায়! পেট তো সেটা শুনবে না। সকালে একমুঠো মুড়ি জল খেয়ে রিকশাটা বের করল। এই জায়গাটা শহর কম, গ্রাম গ্রাম বেশি। মাটির রাস্তা, এলাকার মাঝ বরাবর পিচের রাস্তা চলে গেছে, যেটা পূবদিকে কলকাতা আর পশ্চিম দিকে খড়্গপুরকে ছুঁয়েছে। আশপাশের বাড়িগুলো মূলত একতলা, তবে বেশ ছড়ানো, প্রত্যেক বাড়িতেই সামনে-পিছনে বেশ কিছুটা জায়গায় ফলফুলের গাছ রয়েছে। কিছুটা এগিয়ে ডাইনে বাঁক নিতেই পিছন থেকে ডাক এল, "কে যায় ? নিতাই নাকি!"

নিতাই প্রমাদ গণল, একবার ভাবল না শোনার ভান করে রাস্তাটা পেরিয়ে যায়। কিন্তু তার পা আপনা আপনি প্যাডেল থেকে নেমে এল। রিকশা থেকে নেমে গাড়িটাকে একটু পিছিয়ে এনে উত্তর করল, "হ্যাঁ মাস্টারমশাই, আমি নিতাই। কিছু বলবেন?"

মাস্টারমশাই তাকে হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকলেন। মাস্টারমশাই একদা এখানকার স্কুলের হেডমাস্টারমশাই ছিলেন, বহুদিন আগে অবসর নিয়েছেন। বয়স আশির কাছাকাছি, এনার কাছেও নিতাইয়ের টিকি বাঁধা পড়ে আছে। বিপদে-আপদে এসে হাত পাতলে মাস্টারমশাই ফেরান না। তাই ইচ্ছে না করলেও রিকশাটা বাইরে রেখে গেট পেরিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকতে হয়। বুড়ো কানে ভালো শুনতে পায় না কিন্তু চোখের দৃষ্টি প্রখর। দাওয়া থেকে গাছগাছালির মধ্যে দিয়েও নিতাইকে ঠিক চিনেছে। নিতাই মনে মনে প্রস্তুত হয় এবার মালতির প্রসঙ্গ উঠবে। এই বাড়িতে তার চেয়ে বেশি তার বউয়ের আনাগোনা ছিল। মালতি এখানেও ঠিকে কাজ করত, যদিও গত চারমাস সে কাজ ছিলো না।

উঠোনে দাঁড়াতেই মাস্টারমশাই শুধোলেন, "এটা কি শুনছি নিতাই, তোর বউ নাকি চলে গেছে?" নিতাই কি উত্তর দেবে, চুপচাপ মাটির দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মাস্টারমশাই যদিও বিপক্ষের উত্তরের প্রত্যাশা করেন না, নিজের কথা বলতেই পছন্দ করেন।

"মেয়েছেলেদের একটু শাসনে রাখতে হয়..নিতাই। আলগা দিয়েছো কি গেছো?"

নিতাই কি আর বলবে, সে সুযোগ খোঁজে কখন এই গুহা ছেড়ে বেরোতে পারবে।

এবার সরাসরি প্রশ্ন ধেয়ে এলো, "ছোঁড়াটা কে?"

নিতাই মুখ তোলে, আমতা আমতা করে উত্তরও দেয়। কিন্তু সে উত্তর বুড়োর কানে পৌঁছয় না। ব্যাপারটা বুঝে হাত নেড়ে কাছে ডেকে কানটা বাড়িয়ে দেন। নিতাইয়ের দুপায়ে কে যেন কয়েক মণের ইঁট বেঁধে দিয়েছে। এগোতে মোটেই ইচ্ছে করছে না। আর বলিহারি বুড়োর কৌতূহল, এই বয়সেও পরের হেঁশেলের সবটা খবর না জানতে পারলে দুপুরের ভাত হজম হয় না। না এগিয়ে উপায় নেই, লোকটির কাছে বহু টাকার কর্জ আছে, এক্ষুনি হাত পাতলে নিতাইয়ের ভিটেমাটি সব বাঁধা দিতে হবে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে নামটা আরেকবার বলে, তবে এবার অনেক আস্তে।

"কে?" বুড়ো চেঁচিয়ে ওঠে।

এমন সময় ওনার স্ত্রী ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। নিতাইকে সামনে দেখে ব্যাপারটা বুঝতে কয়েক সেকেন্ড সময় নেন, তারপর ধমকে বলে ওঠেন, "আবার তুমি কাজের সময় মানুষকে ডেকে তাদের সময় নষ্ট করছো! তোমার কাজ নেই বলে কারোর কাজ নেই! জগৎ সংসার এমনি এমনি চলবে!" তারপর নিতাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলেন,  "নিতাই, তুই যা বাবা কাজে যা..বুড়োর বয়সে ভিমরতি হয়েছে..কিছু মনে করিস না বাবা"৷ নিতাই হাত তুলে দুজনকে প্রণাম জানিয়ে তড়িঘড়ি বেরিয়ে আসে।

     

বিয়ের পর যখন দুজনের আঠা আঠা প্রেম তখন মালতি তাঁর একদা প্রেমিক মানিকের কথা বলেছিল। নিতাই মানিককে আগে থেকেই চিনত। এই ছোট জায়গায় সবাই সবাইকে চেনে। মানিক আগে ইঁটখোলায় ম্যানেজারি করত। গত কয়েকবছর পার্টি করছে, এখানকার নেতাদের সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে আর ইদানিং বিল্ডিং মেটেরিয়ালস সাপ্লাই দেয়। অন্যান্য মফঃস্বল শহরের মত তাদের এই জায়গাও আড়েবহরে বাড়ছে। তাই প্রমোটিং ব্যবসা এখানেও রমরম করে চলছে। মানিককে বিয়ে না করে মালতি তার মতো একটা হাড়হাভাতে রিকশাওলাকে বিয়ে করলো কেন নিতাইয়ের মাথায় ঢোকে না। তবে বিয়ের পরও পুরোনো প্রেমিকের জন্য মালতির একটা টান রয়ে গেছে সেটা বুঝতে পারতো। নিতাই কোনোদিনই দাপুটে পুরুষ হতে পারেনি, সবকিছু মেনে নিতে নিতেই জীবনের অর্ধেককাল কেটে গেল। রাস্তাঘাটে মানিকের সাথে দেখা হলে শুকনো আদিখ্যেতা দেখাতো, চায়ের দোকানে নিয়ে গিয়ে চা খাওয়াতো, লম্বা সিগারেট দিত। বুঝতে পারলেও নিতাই চুপ করে থাকত, না বলতে পারতো না। বাড়ি ফিরে মালতির মুখে সুখের ছোঁয়ার সাথে সাথে বাড়ির এখানে ওখানে নতুন নতুন জিনিস চোখে পড়ত। নতুন আয়না, মালতির গায়ে টিয়া রঙা শাড়ি, লাল চিরুনি কিংবা চানঘরে গন্ধওলা সাবান। নিতাই জানে জিজ্ঞাসা করলে মালতি বাবা বা ভাইয়ের কথা বলবে, সেই মিথ্যে বলা থেকে নিষ্কৃতি দিতে কিছু জিজ্ঞাসা করতো না।

 

শুধু একটা মানুষ তার এই উদাসীনতায় রাগ করত, সে হল রতনের বউ নীলিমা। সে মাঝেমাঝেই রতনকে দিয়ে ডেকে পাঠাতো, রতনও একই লাইনে রিকশা চালায়। বাড়িতে ডেকে চা- মুড়ি এগিয়ে দিয়ে নীলিমা বলত, "দাদা আপনি একটু শক্ত হন। সংসারে পুরুষমানুষের একটু শাসন থাকা দরকার, তা নাহলে সংসার বসে না। আপনি দিদির সাথে কথা বলুন, গোটা মহল্লার চোখের ওপর দিয়ে পরপুরুষের সাথে মাখামাখি একদম ঠিক নয়"।

 শুনতে শুনতে নিতাই একমনে চা-মুড়ি খেয়ে চলত। রতনের অস্বস্তি হলেও বউকে বারণ করতে পারতো না। নিতাই চা-মুড়ি শেষ করে রিকশা নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়ত।

  

আজ স্ট্যান্ডে গিয়ে দেখল লাইনে মাত্র দুটো রিকশা আছে। নিজের রিকশাটা পিছনে দাঁড় করিয়ে মথুরদার চায়ের দোকানে ঢুকল। ভিতরে সত্যেনদা আর হারু বসে চা খাচ্ছিল। ওকে দেখে ওরা কেমন থতমত খেয়ে গেল। তারপর সত্যেনদা একটু সরে বসে বেঞ্চে বসার জায়গা করে দিল। মথুরদা লোকটাকে নিতাই পছন্দ করে। কোনো ব্যাপারে অতিরিক্ত কৌতূহল নেই, বেশি কথা বলে না। আবার আশপাশে কেউ অন্যায় কথাবার্তা বললে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদও করে।

সত্যেনদা হাঁক দিল, "মথুরদা নিতাই এয়েছে, ওকে এককাপ চা দাও।"

তারপর খুব আপনজনের মত নিতাইয়ের গায়ে হাত দিয়ে জিজ্ঞাসা করে, "শরীর ভালো আছে, নিতাই?"

সত্যেন মানুষটা খারাপ নয়, তবে নিতাই বুঝতে পারে পাশে বসে ও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জিজ্ঞাসা করবে। নিতাইয়ের এ মুহূর্তে একদম কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। ভগবান তার আকুতি শুনলেন, পরপর দুদফা প্যাসেঞ্জার চলে আসতে ইচ্ছে না থাকলেও হারুর সাথে সত্যেনদাকেও উঠতে হল। নিতাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ধীরে ধীরে চা শেষ করে দোকানের বাইরে এল। আজ আকাশ একদম ঝকঝক করছে। মানুষজনও রাস্তায় বেরিয়েছে। নিতাই গিয়ে নিজের রিকশায় বসে। রতনকে স্ট্যান্ডে দেখতে পাচ্ছে না। হয়ত দূরের কোনও প্যাসেঞ্জার পেয়ে গেছে। কালও বিকেলে ওর বাড়িতে গিয়েছিল। নীলিমা রাতের জন্য রুটি-তরকারি করে পাঠিয়েছিল। বসে বসে কখন নিজের চিন্তায় হারিয়ে গিয়েছিল। সম্বিত ফিরল একটা ক্ষীণ আওয়াজে। বহুদূর থেকে যেন কেউ কিছু বলছে। তাড়াতাড়ি রিকশা থেকে নেমে দাঁড়াল, সামনে একজন বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে। বয়সের ভারে শরীর বেঁকে গেছে, তার ওপর হাতে দুখানা ব্যাগে জিনিসপত্তর। নিতাই তাড়াতাড়ি হাত থেকে ব্যাগগুলো নিয়ে রিকশার হ্যান্ডেলে ঝুলিয়ে ভদ্রমহিলাকে ধরে রিকশায় তোলে। কোথায় যাবেন জিজ্ঞেস করায় উত্তর পায়, কৈবর্ত্যপাড়া। এখান থেকে মাইল দুয়েক রাস্তা, নিতাই সাধারণত ওদিকের ভাড়া কম পায়, তবে কয়েকবার প্যাসেঞ্জার নিয়ে গেছে। বুড়িমায়ের বাড়িটা ঠিক কোথায় জেনে নিয়ে সিটে বসে প্যাডেলে চাপ দেয়।

 

জীবন অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। বাজারহাট খুলেছে, বাসগাড়িও চলতে শুরু করেছে, শোনা যাচ্ছে আস্তে আস্তে লোকাল ট্রেনও চালু হবে। এদিকে আকাশও ঝকঝকে নীল, সাদা মেঘের ভেলাও চোখে পড়ছে, পূজো এসে গেল। তবে এবার পূজো আসবো আসবো করলেও মানুষের মনের ভয় যায়নি। সরকার থেকেও অনেক নিয়নকানুন করা হচ্ছে। অন্যান্য বছরের মত এবার আর হুড়োহুড়ি করে ঠাকুর দেখা চলবে না। আর নিতাইয়ের তো এমনিতেই আবাহনের আগেই সব বিসর্জন হয়ে গেছে। তাই পূজোর জোশ বাড়ুক বা কমুক ওর কিছু এসে যাবে না।

তবে মনকে তো আর দমিয়ে রাখা যায় না। সে যখন চায় পাখা মেলে যেদিকে ইচ্ছে করে উড়ে যেতে পারে। পূজো মানেই মালতির একগাদা ফরমায়েশ। পূরণ না করলেই মেয়ের গাল ফুলে যেত, চোখ ছলছল করত। নিতাই যতটা পারতো করত, বাকিটা আদর দিয়ে পূরণ করে দিত। মেয়েটা একটু অভিমানী ছিল, কিন্তু অবুঝ ছিলো না। তবুও কেন যে সবকিছু ভাসিয়ে....।

 

আসলে দোষ হয়ত নিতাইয়ের, সারাদিন বাইরে বাইরে ঘুরতে ঘুরতে ঘরের বউয়ের মন বুঝে উঠতে পারেনি৷ আর যখন বুঝতে পেরেছে তখন বাধা দিতে পারেনি। মেয়েরা হয়ত তার মত মেনিমুখো ব্যাটাছেলেদের পছন্দ করে না। অন্যদিকে মানিকের বয়স কম, মাচো চেহারা, কাঁচা পয়সা আছে, দেড় লাখ টাকা দামের বাইক নিয়ে ঘোরাফেরা করে। তার সঙ্গে নিতাইয়ের কোনো তুলনাই হয়না, কি করে দোষ দেয় মালতিকে! সে যদি তার সব আবদার মেটাতে পারতো, তারপরও মালতি মানিকের সঙ্গে পালাতো তাহলেও না কথা ছিল। না, মালতিকে সে কোনো দোষ দেয় না।

  

পূজো এল, কিছু মানুষজন রাস্তায় বেরোলো। তবে অন্যবারের মত অত হইচই হল না। মানুষের মনের মধ্যে ভয় এখনও আছে। আশপাশ থেকে মাঝেমাঝেই খবর আসছে, মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, এমনকি মারাও যাচ্ছে। দশমীর দিন বিকেলের দিকে নিতাই কৈবর্ত্যপাড়ার দিকে রিকশা নিয়ে এগিয়ে চলল, না কোনো সওয়ারী নিয়ে নয়। সেই বুড়িমা তাকে আজ বড় টানছে।

  

মা মারা যাওয়ার পর নিতাইয়ের জীবনটা ওলটপালট হয়ে গেল। বুড়ি কি এক অদৃশ্য সুতোয় সংসারটাকে বেঁধে রেখেছিল। বাবা তো সেই কোন ছোটবেলায় মারা গেছে। তারপর কতবছর ধরে মহিলা বুড়ো শ্বাশুড়ি, ছোট ছেলেকে নিয়ে যুদ্ধ করে গেছে। ছেলেকে বড় করেছে, বিয়ে দিয়েছে, মালতিকেও আপন করে নিয়েছিল। যতদিন বেঁচেছিল মালতিও ঠিক ছিল, তারপর...শুধুই অকাল বিসর্জনের গল্প।

 

প্রথমদিন যেদিন মহিলাকে রিকশায় বসিয়ে কৈবর্ত্য পাড়া নিয়ে গিয়েছিল তখনই নিতাইয়ের মনে অনেক প্রশ্ন জেগেছিল। এই বয়সের মহিলাকে এত মোট বইতে হচ্ছে, বাড়িতে আর কেউ নেই নাকি! বোঝা যাচ্ছে অবস্থা গতিকে এখন এই অবস্থা হলেও একটা সময়ে বেশ সম্পন্ন ঘরের মহিলা ছিলেন। কিন্তু কিছু জিজ্ঞাসা করেনি, কি দরকার! কোন কথা কে কিভাবে নেবে বলা খুব মুশকিল। অভিজ্ঞতা তো কম হলোনা। তবে এই দীর্ঘ পথে কোনো কথা যে হয়নি তা নয়। সেটা মূলত বাজার দর আর মারণ রোগ নিয়েই হয়েছে। শেষে যে বাড়ির সামনে এসে ওকে গাড়ি দাঁড় করাতে হয়েছে সেটা দেখে নিতাইয়ের মত লোকও চমকে উঠেছে। মাটির দেওয়ালগুলো সব হেলে পড়েছে, মাথায় কোনো এক সময় টালির চাল ছিল, বারান্দার টালিগুলো সব ভেঙে পড়েছে, আর ঘরের মাথারগুলোও জীর্ণতায় ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে, যে কোনো মুহূর্তে হাঁটু মুড়ে হুড়মুড় করে নেমে আসবে। নিতাই বুড়িকে যত্ন করে রিকশা থেকে নামিয়ে হাত ধরে বারান্দায় তুলে দিল। বুড়ি যখন আঁচলে বাঁধা চাবি দিয়ে অন্ধকার ঘরটা খুলছে তখন নিতাই ব্যাগ দুটো বয়ে নিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে এল। ঘরও ওইরকম, একদিকে একটা পুরোনো তক্তপোষ তাতে কিছু পুরনো বালিশ আর কাঁথা, অন্যদিকে একটা জংধরা টিনের সুটকেস। এতেই বোধহয় বুড়ির যাবতীয় পার্থিব সম্পদ গচ্ছিত থাকে। তক্তপোষের নিচে কয়েকটা অ্যালুমিনিয়ামের বাসনপত্র, একটা জনতা স্টোভ, আর একটা ভাঙা হ্যারিকেন। অন্যের ঘরের ভিতর ঢুকে এভাবে চারদিক খুঁটিয়ে দেখা উচিত নয়, কিন্তু নিতাই না চাইতেও এই দারিদ্র্য লাঞ্ছিত ঘরকন্নায় চোখ পড়ে যাচ্ছে। নিতাইয়ের বাড়িতেও অভাব চতুর্দিকে হাঁ মুখ করে বসে আছে, কিন্তু এই মহিলার সঙ্গতি নিতাইকে সত্যিই কষ্ট দিল। সবথেকে কষ্ট হল যখন জানতে পারল ভদ্রমহিলার কেউ নেই, একা একা এভাবে এই বাড়িতে দিনের পর দিন কাটান৷

  

তারপর থেকে নিতাইকে ভদ্রমহিলার চিন্তা পেয়ে বসল। একটু বৃষ্টি হলেই চিন্তা হয়, ওই আপলকা হেলে পড়া দেওয়ালগুলো যদি ভেঙে পড়ে, কিংবা যদি জ্বর হয় উঠতে না পারে তাহলে জলতেষ্টা পেলে জল দেবারও তো কেউ নেই। প্রতিবেশীরা কি ওনার একটু দেখাশোনা করে! এই চিন্তা থেকে মাঝে দুবার প্যাসেঞ্জার ছাড়াই বুড়িকে দেখে এসেছে। বুড়ি তাকে প্রথমে চিনতে পারেনি, তারপর চিনতে পেরে তার আসার কারণ জেনে খুব খুশি।

“আজকের দিনে বাবা কে কার খবর নেয়! নিজের লোক, পেটের সন্তানই খবর রাখেনা তো অন্য লোক! তুমি যে এই বুড়িটাকে দেখতে ছুটে এসেছো সেই আমার কত ভাগ্যি!"

প্রথমবার না না করলেও, দ্বিতীয়বার বুড়ির হাতে চা আর চিড়ের মোয়া খেয়ে এসেছে। বুড়ি নিতাইয়ের সব খবর নিয়েছে, মালতির পালিয়ে যাওয়ার কথা বাদ দিয়ে নিতাই সব বলেছে। তবে বুড়ি নিজের কোনো কথা বলেনি, আর নিতাই সঙ্কোচে কিছু জিজ্ঞাসা করে উঠতে পারেনি। ষষ্ঠীর দিন নিতাই বুড়িকে কয়েকটা জিনিস কিনে দিয়ে এসেছে, বুড়ি রিকশা ভাড়া বাবদ কিছু টাকা দিতে চেয়েছিল। নিতাই নেয় নি। তখন বুড়ি বলেছিল, "তবে পূজোর মধ্যে একটা দিন আসিস বাবা, মায়ের হাতে একবেলা খেয়ে যাস'। এর মধ্যে সময় করতে পারেনি, আজ দশমীর দিন সকাল সকাল স্নান সেরে ধোপদুরস্ত হয়ে বেরিয়ে পড়েছে।

  নিতাই খোলা বারান্দায় বসে আছে। ভদ্রমহিলা ঘরের ভিতর পা ছড়িয়ে বসে, কোলের ওপর রংচটা একটা অ্যালবাম। যে অ্যালবামের সাদা-কালো পাতায় একটা গোটা জীবনের বহু দীর্ঘশ্বাস আটকে আছে। দূরে বিসর্জনের বাজনা শুরু হয়ে গেছে। দুপুরে বুড়ির হাতে যত্ন করে বানানো শুক্তো, ডাল, কচু শাক আর মৌরলা মাছের ঝাল দিয়ে ভাত খাওয়ার পর বুড়িমা হাতড়ে হাতড়ে টিনের স্যুটকেস থেকে এই অ্যালবাম বের করেছিল, তারপর কয়েক ঘন্টা কিভাবে কেটে গেছে টেরও পায়নি। পশ্চিম আকাশ লালে লাল হয়ে উঠেছে, মনে হচ্ছে মর্ত্যের সাথে সাথে আকাশ সীমানাতেও সিঁদুর খেলা শুরু হয়ে গেছে। মায়ের বিদায় বেলায় চারদিকে একটা মনখারাপ করা আলো ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঘরের ভিতর ভদ্রমহিলা অনেকক্ষণ চুপ করে গেছে, আর বাইরে নিতাইও নিস্পন্দ, নিশ্চল। কখনও তার এই হাত, পা, শরীর সচল ছিল বলে বিশ্বাস হচ্ছে না।

  এতক্ষণ নিতাইয়ের প্রত্যয় হল কেন এই মহিলাকে দেখার পর একটা চোরা টান অনুভব করছিল৷ দুজনের অবস্থান দুই বিপরীত মেরুতে হলেও মেরুরেখা তাদের মধ্যে যোগসূত্রের কাজ করেছে। এখানেও সেই বয়সকালের গল্প। ভুল না ঠিক কে বিচার করবে! সেই যোগ্যতা বা সাহস কোনোটাই নিতাইয়ের নেই। এই গল্পে মনিকার বিয়ে হয় স্কুলমাস্টার সতীনাথের সাথে। সতীনাথ ছোটবেলাতেই বাবা-মাকে হারিয়েছে। এক দূরসম্পর্কের জ্যেঠার কাছে মানুষ। পাশ করে চাকরি পেতে পেতে জ্যেঠা-জ্যেঠিও চোখ বুজলেন। সতীনাথ প্রথম থেকেই একটু অন্যরকম, পড়াশোনার জগতেই সে স্বচ্ছন্দ্য। সংসার কী, সেখানে তার ভূমিকা কী, স্ত্রীর প্রতি কর্তব্য, কিছুই জানতো না, জানার চেষ্টাও করেনি। মনিকার সাথে বয়সেও অনেকটা তফাৎ থাকায় বন্ধুত্বও হয়ে উঠতে পারেননি। মনিকাকে একাকীত্ব গ্রাস করতে শুরু করল, তাঁর অল্পবয়স স্বামীর সোহাগ চাইত, বাড়িতে সারাদিন একা হাঁফিয়ে উঠত, ব্যাকুল হয়ে থাকত কখন স্বামী স্কুল থেকে ফিরবেন। সতীনাথ বাড়ি ফিরে মামুলি কিছু কথাবার্তা সেরে আবার নিজের পড়াশোনার জগতে ডুবে যেতেন। বাচ্ছা মেয়েটির একাকীত্বের কষ্টের কথা তাঁর মাথাতে আসত না। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত হতে হতে নিজের ওপর আস্থা, কর্তৃত্ব সব হারিয়ে ফেললেন মনিকা। সেই দুর্বলতার ফাঁক দিয়ে এসে উপস্থিত হল শ্যামল। স্টেশন মোড়ে অটো চালাত। একদিন নিজের সংসার ছেড়ে একবস্ত্রে শ্যামলের সাথে পালালেন মনিকা। তারপর বাকিটা ইতিহাস। এর পরের পাঁচ বছরে শ্যামল মনিকাকে একটি পুত্র সন্তানের সাথে দিয়েছে অনিঃশেষ অপমান। তারপর মনিকাকে ছেড়ে গিয়ে ভালো মানুষের মত বাবার দেখে দেওয়া মেয়েকে বিয়ে করেছে। আর মনিকা, সমাজের চোখে নষ্টা মেয়েছেলে, কঠোর পরিশ্রমে ছেলেকে মানুষ করার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। ছেলে বড় হয়ে বাপের চেয়েও আরও বড় অমানুষ হয়ে মাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে এখন বউ-বাচ্ছা নিয়ে সংসার করছে। আর সমাজের চোখে এমনকি নিজের চোখেও পাপী এবং পতিতা হয়ে মনিকা এই জীর্ণ, পরিত্যক্ত কুটিরে জীবনের শেষ কটাদিন অতিবাহিত করতে লেগেছে। মৃত্যুই তার নিয়তি, মরণই তার অপেক্ষা! নিতাইয়ের মনে হল, এই জগতে কে কার পাপের বিচার করে! এই মহিলা যদি পাপী হয়, তাহলে শ্যামল বা শ্যামলের ছেলে তারা তো আরও বড় পাপী। সেই হিসাবে মালতিও পাপী! কিন্তু নিতাই মালতিকে একবারও পাপী ভাবতে পারছে না। আচ্ছা সতীনাথও কি মনিকাকে পাপী ভাবত!

    

আজ বিজয়া দশমী। সব মায়ের মুখেই দেবী দুর্গার ছাঁচ বসানো থাকে। মায়েরা কখনও অশুচি হতে পারেনা, পতিতা তো নয়ই। নিতাই মুখ তুলে চায়। অন্ধকার নেমে এসেছে। এই কুটিরে কোথাও আলোর একটা কণাও জ্বলে ওঠেনি। আবছা অন্ধকারে হাই পাওয়ারের চশমা পড়া মনিকার দুই চোখ যেন জ্বলে উঠল, কোথা থেকে একটা আলোর বলয় দুলতে দুলতে এসে মহিলার কপালে স্থির হল। নিতাইয়ের অবাক চোখের সামনে সেখানে ত্রিণয়ন স্থির হল। কোন এক অদৃশ্য শক্তি নিতাইয়ের স্থাণুবৎ শরীরটাকে হ্যাঁচকা টানে তুলে দিল। একটা ঘোরের মধ্যে নিতাই ধীরে ধীরে হেঁটে বুড়ির কাছে পৌঁছল। একটা শব্দও উচ্চারণ না করে বুড়িকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। বাচ্ছা শিশুর মত বুড়িও নিতাইয়ের কোলে চুপটি করে পড়ে রইল। নিতাই বারান্দা থেকে সিঁড়ি ভেঙে নেমে উঠোন পেরিয়ে বুড়িকে নিয়ে রিকশায় বসালো।

বুড়ি একটা কথাও বললো না, এমনকি পিছন ফিরে বাড়িটার দিকেও তাকালো না। রিকশায় উঠে নিতাই প্যাডেল করতে শুরু করল। রাস্তা জুড়ে মা দূর্গার বিসর্জনের মিছিল বেরিয়েছে। 'বলো দুর্গা মাঈ কী!’ ধ্বনির মধ্যে দিয়ে নিতাইয়ের রিকশা এগিয়ে চলল। তার মুখে একটা স্বর্গীয় হাসি। আজ সে প্রথমবার সবাইকে হারিয়ে দিয়ে জিতে গেছে। সবাইয়ের মায়ের বিসর্জনের দিনে সে তার মাকে আবাহন করে নিয়ে যাচ্ছে।

  …….

 

Mailing List