চিরনূতনেরে দিল ডাক পঁচিশে বৈশাখ, করোনাকালেও অক্সিজেন কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

চিরনূতনেরে দিল ডাক পঁচিশে বৈশাখ, করোনাকালেও অক্সিজেন কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
09 May 2021, 11:39 AM

চিরনূতনেরে দিল ডাক পঁচিশে বৈশাখ, করোনাকালেও অক্সিজেন কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী

 

রবীন্দ্রনাথ জন্মেছেন ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ, (১৮৬১ খ্রিস্টাব্দ, ৭মে), রাত ২টা ২৮ মিনিট ৩৭ সেকেন্ড সময়ে | এ এক পুণ্য ক্ষণ | আমরা পেয়েছি এক বিস্ময়-মানুষকে | ‘পঁচিশে বৈশাখ’-এক ইতিহাস |

 

১২৯২ বঙ্গাব্দের ১৫ পৌষ (১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দ, ২৯ ডিসেম্বর) ঠাকুরবাড়িতে ইন্দিরা দেবীর (১৮৭৩-১৯৬০) ত্রয়োদশ জন্মদিন পালিত হয়েছিল | ইন্দিরা দেবী (১৮৭৩-১৯৬০) ও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮১৭– ১৯০৫) দ্বিতীয় পুত্র সত্যেন্দ্রনাথ (১৮৪২-১৯২৩) ও জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর (১৮৫০–১৯৪১) কন্যা | রবীন্দ্রনাথ তাঁর এই প্রিয় ভাইঝিকে সেদিন উপহার দিয়েছিলেন একটি পিয়ানোর মত গড়নের কাঠের বাক্স ও তাঁর লেখা ‘জন্মতিথির উপহার’ কবিতা |

 

 

সেই কবিতার প্রথম কয়েকটি ছত্রঃ

‘স্নেহ-উপহার এনেছি রে দিতে

লিখেও এনেছি দু-তিন ছত্তর।

দিতে কত কী যে সাধ যায় তোরে

দেবার মতো নেই জিনিস-পত্তর!’

(কড়ি ও কোমল/ চৈত্র ১২৯২)

 

১২৯৩ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ (১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দ, ৭মে) রবীন্দ্রনাথ ২৫ বছর পূর্ণ করে ২৬-এ পদার্পণ করলেন | শ্রীশচন্দ্র মজুমদার কে (১৮৬০-১৯০৮) লিখলেনঃ

‘আজ আমার জন্মদিন—পঁচিশে বৈশাখ—পঁচিশ বৎসর পূর্বে এই পঁচিশে বৈশাখে আমি ধরণীকে বাধিত করতে অবতীর্ণ হয়েছিলুম—জীবনে এমন আরো অনেকগুলো পঁচিশে বৈশাখ আসে এই আশীর্বাদ করুন | জীবন অতি সুখের |’

 

 

শ্রীশচন্দ্র তাঁর সুহৃদ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বৈষ্ণব পদের সংকলন ‘পদরত্নাবলী’ (১৮৮৫) সম্পাদনা করেছেন | রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য জীবনকে তাঁর সমকালের যে ক’জন বন্ধু পুষ্ট করেছেন তাঁদের মধ্যে শ্রীশচন্দ্র মজুমদার অন্যতম | শ্রীশচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪) প্রবর্তিত ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ত্ব পালন করেছেন | ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার সুবাদে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর প্রগাঢ় বন্ধুত্ব তৈরী হয় |

১২৯৪ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ (১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে, ৭মে) তাঁর জন্মদিনে কবিকে সরলাদেবীর দাদা জ্যোৎস্নানাথ উপহার দিয়েছিলেন ‘The Poems of Heine’ এই গ্রন্থ | রবীন্দ্রনাথ তাঁর জন্মদিনের প্রথম উপহার এই বইয়ের পাতায় লিখে রেখেছিলেনঃ

‘শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

২৫ বৈশাখ

জন্মদিনের উপহার

১৮৮৭

জ্যোৎস্নার কাছ হইতে

৪৯ পার্কস্ট্রিট |’

 

রবীন্দ্রনাথ সেদিন ৪৯ নং পার্কস্ট্রীটে মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথ(১৮৪২-১৯২৩) ও মেজ বৌঠান জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর (১৮৫০–১৯৪১) সঙ্গে ছিলেন। বিপত্নীক জ্যোতিরিন্দ্রনাথও (১৮৪৯-১৯২৫) ছিলেন সেদিন ঐ বাড়িতে |

ঐদিন স্বর্ণকুমারী দেবীর কন্যা সরলা দেবী খুব ভোরে কাশিয়াবাগান থেকে দাদা জ্যোৎস্নানাথকে সঙ্গে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন পার্ক স্ট্রিটের বাড়িতে | সঙ্গে নিয়েছিলেন বাড়ির বকুল ফুলের নিজের হাতে গাঁথা মালা | পথে কিনে নিয়েছিলেন বেল ফুলের মালাসহ অন্যান্য আরো ফুল | সাথে একজোড়া ধুতি-চাদর | ৪৯ নং পার্ক স্ট্রিটের বাড়িতে নিঃশব্দে ঢুকে সোজা চলে গেলেন রবীন্দ্রনাথের ঘরে | ঘুমন্ত রবীন্দ্রনাথকে জাগিয়ে ফুল-মালা-ধুতি-চাদর-এই নৈবেদ্য তাঁর পায়ের কাছে রেখে প্রণাম করলেন | জ্যোৎস্নানাথ রবীন্দ্রনাথকে প্রণাম করে উপহারগুলি দিলেন | এরপর আশপাশের ঘর থেকে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও বেরিয়ে এসে রবীন্দ্রনাথকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা আশীর্বাদ প্রণাম জানালেন | সারা বাড়িতে ‘রবির জন্মদিন’ বলে সাড়া পড়ে গেল |

২৭ বছরের রবীন্দ্রনাথের অনুভব বন্ধু শ্রীশচন্দ্র কে লেখা চিঠিতে প্রকাশিতঃ

‘দিনের পর দিন চলে যাচ্ছে, কেবল বয়স বাড়ছে | দু’বৎসর আগে পঁচিশ ছিলুম, এইবার সাতাশে পড়েছি—এই ঘটনাটাই কেবল মাঝে মাঝে মনে পড়ছে, আর কোনো ঘটনা তো দেখছি নে | কিন্তু সাতাশ হওয়াই কি কম কথা! কুড়ির কোঠার মধ্যাহ্ন পেরিয়ে ত্রিশের অভিমুখে অগ্রসর হওয়া | ত্রিশ, অর্থাৎ ঝুনো অবস্থা | অর্থাৎ যে অবস্থায় লোকে সহজেই রসের অপেক্ষা শস্যের প্রত্যাশা করে–কিন্তু শস্যের সম্ভাবনা কই? এখনো মাথা নাড়া দিলে মাথার মধ্যে রস থল্‌ থল্‌ করে–কই, তত্ত্বজ্ঞান কই?... আর তো ফাঁকি দিয়ে চলে না |’

 

১৩০৯বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ (১৯০২ খ্রিস্টাব্দ, ৮ মে) রবীন্দ্রনাথ ৪২ বছর বয়সে প্রবেশ করলেন | সেদিন তিনি ছিলেন শান্তিনিকেতনে | জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে অনেকে সেদিন শান্তিনিকেতনে উপস্থিত হোন | ঐদিন রবীন্দ্রনাথ, জামাতা সত্যেন্দ্রনাথের খুল্লতাত নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যকে লেখেনঃ

‘আজ জন্মদিনের প্রভাতে আপনার প্রীতিপূর্ণ পত্র পাইয়া বড় আনন্দ লাভ করিলাম—ঈশ্বরের অনেক প্রসাদ অযাচিত পাইয়াছি তাহার মধ্যে আপনাদের প্রীতি একটি | ঈশ্বর যদি আমাকে এমন গুণ দিয়া থাকেন যাহাতে পরিচিত-অপরিচিত অনেক হৃদয়ের মধ্যে আমি অবারিত অধিকার লাভ করিয়া থাকি তবে আমি ধন্য |...’

 

এই বছরের ৭ অগ্রহায়ন, (১৯০২ খ্রিস্টাব্দ, ২৩ নভেম্বর) রবিবার রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর (১৮৭৩-১৯০২) মৃত্যু হয়|

১৩১০ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ দিনটি (১৯০৩ খ্রীস্টাব্দ, ৮ মে) রবীন্দ্রনাথের খুব ভালো কাটেনি| পত্নীবিয়োগের শোকের পর মধ্যমা কন্যা রেনুকার (১৮৯০-১৯০৩) অসুস্থতা| ১৯০৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর যক্ষা রোগে মারা যান কন্যা রেনুকা| পত্নী শোকে ও সন্তান শোকে ব্যথিত রবীন্দ্রনাথ তাঁর জন্মদিন পালন নিয়ে একপ্রকার উদাসীন ছিলেন|

১৩১৪ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ (১৯০৭ খ্রিস্টাব্দ, ৮ মে) রবীন্দ্রনাথের বয়স হলো ৪৭ বছর | সেদিনও তাঁর জন্মদিন ছিল অনাড়ম্বর | ঐবছর ৭ অগ্রহায়ণ (১৯০৭, ২৪ নভেম্বর) রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠপুত্র শমীন্দ্রনাথের (১৮৯৬-১৯০৭) মৃত্যু হয় কলেরায় | সেদিনের কথা রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন কন্যা মীরাকে (১৮৯৩-১৯৬৯) :

‘যে রাত্রে শমী গিয়েছিল সে রাত্রে সমস্ত মন দিয়ে বলেছিলুম বিরাট বিশ্বসত্তার মধ্যে তার অবাধ গতি হোক্‌ | আমার শোক তাকে যেন পেছন না টানে |’

বিধাতার এই বিধান অবিচল চিত্তে গ্রহণ করে কাদম্বিনী দেবীকে কবি লিখেছিলেনঃ

‘ঈশ্বর আমাকে বেদনা দিয়াছেন কিন্তু তিনি তো আমাকে পরিত্যাগ করেন নাই | তিনি হরণও করিয়াছেন, পূরণও করিবেন |’

 

১৩১৭ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ (১৯১০ খ্রীষ্টাব্দ, ৮ মে) রবীন্দ্রনাথ ৪৯ পেরিয়ে ৫০ বর্ষে পদার্পণ করলেন | শান্তিনিকেতনে সেদিনের জন্মোৎসবের কথা উল্লেখ করেছেন, ‘রবীন্দ্রজীবনী’ রচয়িতা প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ঃ

‘আশ্রমের নিরালার মধ্যে যে আনন্দ উৎসব সম্পন্ন হইল, তাহা অত্যন্ত আন্তরিক নিতান্ত আত্মীয়দের উৎসব |’ সেদিনের অনুষ্ঠানের কথা জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রিয়ম্বদা দেবীকে লেখেনঃ

‘আজ এখানে প্রাতে আমার জন্মদিনের উৎসব হয়ে গেল | আমার যে একটা জন্মদিন আছে সে কথা ভুলে গিয়েছিলুম | বহুকাল হয়ে গেল যখন আত্মীয় পরিজনের স্নেহের মধ্যে এই উৎসব হত—কিন্তু সে যেন জন্মান্তরের কথা | আজ মনে হল আর ক্ষেত্রে নবজন্ম লাভ করেছি—এখন যারা আমার কাছে এসেছে আমাকে কাছে পেয়েছে তাদের সঙ্গে আত্মীয়তার কোনো সম্বন্ধই নেই—তারা কত দেশের কত ঘরের কত ছেলে | তারাই আনন্দ করে আজ সকালে আমাকে নিয়ে উৎসব করেছে—এই আমার আশ্রমের জীবন—এই আমার মঙ্গললোকে নূতন জন্মলাভ—ঈশ্বর আমার জন্মকে সার্থক করুন এই প্রার্থনা করি |’

 

১৩১৮ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ (১৯১১ খ্রীষ্টাব্দ, ৮মে) রবীন্দ্রনাথ ৫০পূর্ণ করে ৫১ তে প্রবেশ করলেন |

সেদিন ভোরে আম্রকুঞ্জে জন্মোৎসবের আসর বসে | ‘কাশীর ব্যাসবেদীর অনুকরণে বেদী নির্মাণ করে আলপনা, ধূপ-দীপ, গন্ধ-পুষ্প প্রভৃতি দিয়ে সাজানো হয়েছিল | সকলে স্নান করে উৎসবক্ষেত্রে সমবেত হন | দীনেন্দ্রনাথ ছাত্রদের নিয়ে গান করেন | ক্ষিতিমোহন, বিধুশেখর ও নেপালচন্দ্র আচার্যের কার্য করেন |’ জন্মোৎসবের একটি অনুষ্ঠান পত্রে ছাপানো হয়েছিল—

‘শান্তিনিকেতন-ব্রহ্মচর্য্যাশ্রমাধিপতি

পরমভক্তিভাজন

শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মহাশয়ের

পঞ্চাশতম জন্মতিথি-উৎসবে...’

ভোরবেলা অনুষ্ঠান শুরু হয় | তৈত্তিরীয়, আরণ্যক, বাজসনেয় সংহিতা, ঋগ্‌বেদ, শতপথ ব্রাহ্মণ এবং অথর্ববেদ থেকে নেওয়া কিছু মন্ত্রকে, মঙ্গলগীতি, আবাহন, অর্ঘ্যপ্রদান এবং শান্তি— এই চার ভাগে ভাগ করে, মূল এবং বাংলা অনুবাদ করে পাঠ করা হয় |

এই প্রথম ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’-এর উদ্যোগে কবির জন্মদিন উপলক্ষ্যে একটি অনুষ্ঠান ঘটা করে সম্পন্ন করার কথা ভাবা হয় |

রবীন্দ্রজন্মোৎসব পালনের জন্য প্রথমে একটি কমিটি গঠিত হয়েছিল | কমিটির পক্ষ থেকে হীরেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৬৮-১৯৪২) কবির জন্মতিথি পালনের জন্য একটি আবেদনপত্র লেখেন | তাতে তিনি লেখেনঃ

‘আগামী ২৫শে বৈশাখ কবিবর শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় ৫০ বৎসর সম্পূর্ণ করিয়া ৫১ বৎসরে পদার্পণ করিবেন | রবীন্দ্রবাবু আমাদের দেশের একজন শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক, তিনি বহু বর্ষ ধরিয়া নানা ভাবে বঙ্গভাষা ও বঙ্গদেশের কল্যাণ সাধন করিয়াছেন | তাঁহার এক পঞ্চাশৎতম জন্মতিথি উপলক্ষ্যে তাঁহাকে যথোচিত অভিনন্দন দেওয়া ও সংবর্দ্ধনা করা দেশবাসীর কর্ত্তব্য বলিয়া মনে হওয়াতে, নিম্নলিখিত মহোদয়গণকে লইয়া একটি সমিতি সংগঠিত হইয়াছে | সমিতি ইচ্ছা করিলে সভ্য সংখ্যা বৃদ্ধি করিতে পারিবেন |

 

ইতিপূর্বে আমরা দেশের সাহিত্যিকগণকে যথোচিত সম্মান দেখাই নাই; তাহাতে আমাদের জাতীয় ত্রুটি হইয়াছে | রবীন্দ্রবাবুর আগামী জন্মতিথি উপলক্ষ্যে যেন আমরা ঐ ত্রুটির সংশোধন আরম্ভ করিতে পারি |

রবীন্দ্রবাবুর প্রতি সম্মানদান যাহাতে দেশব্যাপী হয়, তজ্জন্য সমিতি দেশের প্রতিভূস্বরূপ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদকে এই কার্য্যের ভার গ্রহণ করিতে অনুরোধ করিবেন | এবং পরিষদের সহিত পরামর্শ করিয়া উৎসবের দিন ও প্রণালী ধার্য্য করিবেন |

সমিতি স্থির করিয়াছেন যে, উৎসব দিবসে সাধারণ উৎসবের সঙ্গে কবিবরকে অভিনন্দন ও শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ উপহার দেওয়া হইবে এবং কবিবরের নাম স্মরণীয় করিবার উদ্দেশ্যে বঙ্গসাহিত্যের উন্নতিকল্পে কোনো স্থায়ী অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হইবে | সমিতির উদ্দেশ্য কার্যে পরিণত করিবার জন্য সমিতি সাধারণের সহানুভূতি ও অর্থসাহায্য প্রার্থনা করিতেছেন | এই বিষয়ে সকলেরই যোগদান প্রার্থনীয় | যিনি যাহা দিবেন সাদরে গৃহীত হইবে এবং সংবাদ পত্রে স্বীকৃত হইবে | সমিতির ধনরক্ষক শ্রীযুক্ত ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী মহাশয়ের নামে ৫৩ নং সুকিয়া স্ট্রীট, কলিকাতা, ঠিকানায় চাঁদা পাঠাইতে হইবে |’

 

সমিতির সদস্যগণঃ শ্রী প্রফুল্লচন্দ্র রায়, শ্রী যতীন্দ্রনাথ চৌধুরী, শ্রী হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, শ্রী আশুতোষ চৌধুরী, শ্রী সারদাচরণ মিত্র, শ্রী ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, শ্রী রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, শ্রী মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী, শ্রী জগদীশচন্দ্র বসু।

১৩১৮ বঙ্গাব্দের ১৪ মাঘ, (১৯১২ খ্রীষ্টাব্দ, ২৮ জানুয়ারি) রবিবার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথকে সংবর্ধনা দেওয়া হয় কোলকাতার টাউন হলে | তখন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সম্পাদক ছিলেন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী (১৮৬৪ -১৯১৯) ও সভাপতি ছিলেন সারদা চরণ মিত্র (১৮৪৮-১৯১৭) | সংবর্ধনা সভার আমন্ত্রণ লিপিতে লেখা ছিলঃ

সবিনয় নিবেদন—

আগামী ১৪ই মাঘ (২৮শে জানুয়ারী) রবিবার অপরাহ্ণ চারিটার সময় কলিকাতা টাউন হলে কবিবর শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের পঞ্চাশতম বৎসর পূর্ণ হওয়া উপলক্ষ্যে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ কবিবরকে অভিনন্দন করিবেন | মহাশয় যথাসময়ে সভাস্থলে উপস্থিত থাকিয়া কবি সম্বৰ্দ্ধনায় যোগদান করিলে অনুগৃহীত হইব | ইতি

বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষৎ মন্দির বশংবদ

২৪৩/১ আপার সার্কুলার রোড শ্রী রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী

কলিকাতা সম্পাদক

বঙ্গাব্দ ১৩১৮ তারিখ, ৩রা মাঘ

এই আমন্ত্রণপত্রে লেখা ছিল, বিকেল চারটের সময় অনুষ্ঠান শুরুর কথা; কিন্তু তার বহু আগে থেকেই মানুষজন ভিড় করেন সভাস্থলে | রবীন্দ্রবিরোধীরা অনুষ্ঠান বয়কট করেন | সভার বর্ণনা দিয়ে সীতাদেবী লিখেছিলেনঃ

‘আমরা গিয়া দেখিলাম রবীন্দ্রনাথ তখনও সভাস্থলে আসিয়া পৌঁছান নাই | জনতা কখনও নীরবে থাকিতে পারে না, এক-একজন করিয়া সুবিখ্যাত ব্যক্তির আবির্ভাব হয় আর করতালির মহা ঘটা পড়িয়া যায় | স্বর্ণকুমারীদেবী, সরলাদেবী, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, গোপালকৃষ্ণ গোখলে প্রভৃতি এইপ্রকার করতালির ভিতর দিয়া সভাস্থলে প্রবেশ করিলেন |...

বিরাট টাউন-হল যখন করতালির শব্দে টলিতে লাগিল তখন বুঝিতে পারিলাম রবীন্দ্রনাথ আসিতেছেন | তাঁহার চারি দিকে বিষম ভিড়, মঞ্চের উপর আসিয়া না বসা পর্যন্ত তাঁহাকে একরকম দেখিতেই পাওয়া গেল না | তাহার পর সভার কার্য আরম্ভ হইল ঐকতান বাদ্যের দ্বারা | তখনও এত কোলাহল চলিতেছে যে অতগুলি বাজনার শব্দ তাহার ভিতরেই ডুবিয়া গেল |’

 

এই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রের কথা আগেই উল্লেখ করেছি | কার্ডের পাশাপাশি একটি অনুষ্ঠানসূচিও ছাপানো হয়েছিল | সেই অনুষ্ঠানসূচির মলাটের পাতায় ছিলঃ

কবিসম্বৰ্দ্ধনা

কবিবর শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের পঞ্চাশতম বর্ষ পূর্ণ হওয়া

উপলক্ষ্যে বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ

কর্ত্তৃক

তাঁহার সম্বর্দ্ধনা ও অভিনন্দন |

স্থান— টাউন হল, কলিকাতা |

সময় ১৪ মাঘ, ১৩১৮–২৮ জানুয়ারী ১৯১২, রবিবার

অপরাহ্ণ ৪ ঘটিকা |

সভাপতি—শ্রীযুক্ত সারদাচরণ মিত্র, এম. এ., বি. এল্‌. |

(বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদের সভাপতি)

বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পক্ষ থেকে সম্পাদক রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী অভিনন্দন-পত্র পাঠ করলেনঃ

কবিবর শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়

করকমলেষু

বাঙ্গালীর জাতীয় জীবনের নবাভ্যুদয়ে নূতন প্রভাতের অরুণ-কিরণ-পাতে যখন নবশতদল বিকশিত হইল, ভারতের সনাতনী বাগ্‌দেবতা তদুপরি চরণ অর্পণ করিয়া দিগন্তে দৃষ্টিপাত করিলেন | অমনি দিগ্বধূগণ প্রসন্ন হইলেন, মরুদগণ সুখে প্রবাহিত হইলেন, বিশ্বদেবগণ অন্তরিক্ষে প্রসাদপুষ্প বর্ষণ করিলেন, ঊর্দ্ধব্যোমে রুদ্রদেবের অভয়ধ্বনি ঘোষিত হইল, নবপ্রবুদ্ধ সপ্তকোটি নরনারীর হৃদয় মধ্যে ভাবধারা চঞ্চল হইল | বঙ্গের কবিগণ অপূৰ্ব্ব স্বরলহরীর যোজনা করিয়া দেবীর বন্দনাগানে প্রবৃত্ত হইলেন, মনীষিগণ স্বহস্তাবচিত কুসুমোপহার তাঁহার শ্রীচরণে অর্পণ করিয়া কৃতার্থ হইলেন |

 

এই অভিনন্দনের উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেনঃ

“...আজ চল্লিশ বৎসরের ঊর্দ্ধকাল সাহিত্যের সাধনা করিয়া আসিয়াছি—ভুলচুক যে অনেক করিয়াছি এবং আঘাতও যে বারম্বার দিয়াছি তাহাতে কোনোই সন্দেহ থাকিতে পারে না | আমার সেই সমস্ত অপূর্ণতা, আমার সেই কঠোরতার বিরুদ্ধতার ঊর্দ্ধে দাঁড়াইয়া আপনারা আমাকে যে মাল্যদান করিয়াছেন তাহা প্রীতির মাল্য ছাড়া আর কিছুই হইতে পারে না | এই দানেই আপনাদের যথার্থ গৌরব এবং সেই গৌরবেই আমি গৌরবান্বিত|”

১৩২৪ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ, (১৯১৭ খ্রীষ্টাব্দ, ৮ মে) রবীন্দ্রনাথ ৫৭ বছরে পদার্পণ করলেন | সেদিন তিনি শান্তিনিকেতনে ছিলেন | সেদিনের কথা স্মৃতি-চারণ করেছেন রবীন্দ্রজীবনীকারঃ

‘বিচিত্রা-ভবনে খুব জাঁকাইয়া কবির জন্মোৎসব হইল |’ সেদিন শান্তিনিকেতনে অনুষ্ঠিত উৎসবে উপস্থিত ছিলেন, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় (১৮৬৫-১৯৪৩) সস্ত্রীক সুকুমার রায় (১৮৮৭-১৯২৩) সপরিবারে কালিদাস নাগ (১৮৯১—১৯৬৬) রথীন্দ্রনাথ (১৮৮৮-১৯৬১) ও প্রতিমা দেবী (১৮৯৩- ১৯৬৯) | বৈতালিক গানে ভোর হলো শান্তিনিকেতনে—‘আমার মুখের কথা তোমার নাম দিয়ে দাও ধুয়ে |’...  ফুল-পাতা-আলপনা দিয়ে সাজানো হলো আম্রকুঞ্জ | পন্ডিত বিধুশেখর শাস্ত্রী  বৈদিক পদ্ধতিতে মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান সম্পন্ন করলেন |

১৩২৫ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ (১৯১৮ খ্রীষ্টাব্দ, ৮ মে) রবীন্দ্রনাথ ৫৮ পদার্পণ করলেন | সেদিনের অনুষ্ঠান হয়েছিল কোলকাতায় | পুত্র রথীন্দ্রনাথ এই উৎসবের কথা লিখেছেন তাঁর ডায়রিতেঃ

‘...birthday celebration comes off tonight. About 100 guests have been invited. Nandalal & others under the direction of Aban dada have tastefully decorated the upper hall of Bichitra for the feast with flowers & painting on the ground around which in a rectangle the seats for the guests have been arranged. Mrs. [Indira] Chaudhuri has arranged to entertain with music selected from different periods of father’s writings, while father has agreed to say a few words explaining the differences in melody, expression, metre etc. of these different periods.’

 

১৩২৬ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ (১৯১৯ খ্রীষ্টাব্দ, ৮ মে) রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে ছিলেন | সেদিনের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কালিদাস নাগ (১৮৯১-১৯৬৬) সুকুমার রায় (১৮৮৭-১৯২৩) প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ (১৮৯৩-১৯৭২) অরুণচন্দ্র সেন |

 

কালিদাস নাগ এদিনের স্মৃতি-চারণ করেছেনঃ

‘ভোরে উঠে জন্মদিনে তাঁকে প্রণাম করে উপাসনায় যোগ দিলুম—তারপর তাঁর ঘরে এসে সকলে বসে তাঁর ধর্ম অথবা আর্টের অভিব্যক্তি কেমন ধারায় চলছে, সে বিষয়ে তাঁর মুখে শোনা গেল |’

১৩২৮ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ (১৯২১ খ্রীষ্টাব্দ, ৮মে) রবীন্দ্রনাথ জেনিভাতে অবস্থান করছিলেন | ২৩ বৈশাখ সি.এফ. অ্যান্ড্রুজকে (১৮৭১–১৯৪০) লেখেনঃ

‘আজকার দিন যথার্থভাবে আমার জন্য নহে, যাহারা আমাকে ভালোবাসে তাহাদেরই আনন্দের দিন |...’

 

এই বছর রবীন্দ্রনাথের জার্মান জীবনীকার হাইনরিখ মিয়ার বেনফী (১৮৬৯-১৯৪৫)-র উদ্যোগে রবীন্দ্রজন্মোৎসব পালনের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিলো | ঐ কমিটি-তে ছিলেনঃ

“Count Johann Hartwig Ernst von Bernstorff, Rudolf Christoph Eucken, Dr. Adolf von Harnack, Gerhart Hauptmann, Conrad Hauptmann, Hermann Karl Hesse, Dr. Hermann Jakobi, Count Hermann von Keyserling, Dr. Heinrich Meyer-Benfey, Helene Meyer-Franck, Dr. Richard Wilhelm, Kurt Robert Wilhelm Wolff.”

 

১০ মে সি. এফ. অ্যান্ড্রুজকে রবীন্দ্রনাথ লিখলেনঃ

“I have just received a birthday greeting from Germany through a committee consisting of men like Eucken, Harnack, Hauptmann and others and with it a most generous gift consisting of, at least, four hundred copies of valuable German books. It has deeply touched my heart and I feel certain that it will find response in the hearts of my countrymen.”

১৩৩২ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ (১৯২৫ খ্রীষ্টাব্দ, ৮মে) রবীন্দ্রনাথের ৬৫তম জন্মদিন পালিত হলো শান্তিনিকেতনে | পন্ডিত বিধুশেখর শাস্ত্রী (১৮৭৮-১৯৫৯) এই উৎসব উপলক্ষ্যে একটি শ্লোক রচনা করেনঃ

‘পান্থানাং চ পশুণাং চ পক্ষিণাং চ হিতেচ্ছায়া

এষা পঞ্চবটী যত্নান রবীন্দ্রেণেহ রোপিতা |’

 

২৪ বৈশাখ জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী (১৮৬৯-১৯৪৮) রবীন্দ্রনাথ-কে অভিনন্দন জানিয়ে লেখেনঃ

‘Suneeti Devi tells me she is going to Bolpur to take part in the celebration of your 65th birthday. May I add my wish and prayer to the many that will be sent up tomorrow for your health and long life.’

 

১৩৩৫ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ (১৯২৮ খ্রীষ্টাব্দ, ৮ মে) রবীন্দ্রনাথ ৬৮ বছরে পৌঁছলেন | ঐদিন তাঁকে তুলাদণ্ডের একদিকে বসিয়ে আরেক দিকে বিশ্বভারিতী প্রকাশিত তাঁর লেখা গ্রন্থগুলি রাখা হলো সম ওজনের | নানা পাবলিক লাইব্রেরী ও প্রতিষ্ঠানে ঐ বইগুলো দান করা হয়েছিলো | এবছরের অনুষ্ঠান হয় কোলকাতার বিচিত্রা ভবনে | ‘বিশ্বভারতী’ থেকে ঐদিন ঐ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন অনেকেই | পরের দিন ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকায় এই অনুষ্ঠানের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিলোঃ

‘...বিশ্বভারতী সম্মিলনীর সদস্যগণ কবিকে তাঁহার কলিকাতাস্থ বাসভবনে বিপুলভাবে অভিনন্দিত করেন | সম্পূর্ণ প্রাচ্যরীতি অনুসারে পুষ্পবৃষ্টি করিয়া ধূপধুনার দ্বারা এবং শঙ্খবাদন করিয়া ও সুললিত সঙ্গীতের দ্বারা কবিকে সংবৰ্দ্ধিত করা হইয়াছিল | এই অনুষ্ঠানে বহুসংখ্যক গণ্যমান্য এবং বিশিষ্ট ভদ্রলোক ও মহিলা যোগদান করিয়াছিলেন | তন্মধ্যে অধ্যাপক যদুনাথ সরকার, শ্রীযুত রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, শ্রীযুত জয়গোপাল ব্যানার্জ্জী, শ্রীযুত প্রমথনাথ চৌধুরী, ডাক্তার এস. এন. চৌধুরী, শ্রীযুত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শ্রীযুত গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, শ্রীযুত সমরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ডাক্তার সুনীতি চ্যাটার্জ্জী, ডাক্তার কালিদাস নাগ, শ্ৰীযুত অমল হোম, শ্রীযুত অশ্বিনীকুমার ঘোষ, শ্রীমতী ইন্দিরাদেবী, শ্রীমতী প্রতিমা দেবী, শ্রীমতী শান্তা দেবী প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য |’

১৩৩৭ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ (১৯৩০ খ্রীষ্টাব্দ, ৮ মে) রবীন্দ্রনাথ ৭০ বছরে পৌঁছলেন | সেদিন তিনি ছিলেন প্যারিসে | প্যারিস থেকে নির্মলকুমারী মহলানবিশ-কে রবীন্দ্রনাথ লেখেনঃ

‘আজ আমার জন্মদিন |... এখানে যে রবীন্দ্রনাথ আছে সে এখানকার উপকরণ নিয়ে নিজেকে একটা সম্পূর্ণতা দিয়েছে | তার সঙ্গে পঁচিশে বৈশাখের রবি ঠাকুরের মিল হবে না | দেশে ফিরে গেলে তবে আমি তাকে ফিরে পাব, সেখানকার সব কিছুর সঙ্গে |...’

 

রবীন্দ্রনাথের ৭০ বছর পূর্তিতে শান্তিনিকেতন ও কোলকাতায়ও খুব বড়ো অনুষ্ঠান হয়েছিলো | কোলকাতায় টাউন হলে ৭দিন ব্যাপী রবীন্দ্র-জয়ন্তী অনুষ্ঠানকে ‘ঠাকুর সপ্তাহ’ বলে অভিহিত করা হয়েছিলো | ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের ২৩ ফাল্গুন (১৯৩১ খ্রীষ্টাব্দ, ৭মার্চ) আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ঃ

‘আগামী ২৫শে বৈশাখ, ৮ মে কবি রবীন্দ্রনাথের বয়স ৭০ বৎসর পূর্ণ হইবে | তাঁহার জন্মতিথি উৎসব যাহাতে যথাযোগ্যভাবে অনুষ্ঠিত হয়, এজন্য কবির ভক্তবৃন্দ এক নিবেদন প্রচার করিয়াছেন | বাঙ্গালী জাতির গর্ব ও গৌরব কবি রবীন্দ্রনাথ জাতির হৃদয়ে যে স্থান অধিকার করিয়া রহিয়াছেন, তাহাতে সহস্র সহস্র নরনারীর সাহায্য ও যোগদানে এই উৎসব যথার্থ জাতীয় উৎসব হইবে, তাহাতে আমাদের অণুমাত্র সন্দেহ নাই | আমরা এই পুণ্যতিথির আয়োজন সর্বাঙ্গসুন্দর করিবার জন্য অনুষ্ঠাতাদের সহিত একযোগে দেশবাসীকে আহ্বান করিতেছি |’

 

১৩৩৮ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন পালনের যে চিঠি ছাপা হয় তা রচনা করেছিলেন রাজশেখর বসু (১৮৮০-১৯৬০) | চিঠিটি ছিলো এইরকমঃ

রবীন্দ্র-জয়ন্তী

সবিনয় নিবেদন—

অদ্য ২৫শে বৈশাখ ১৩৩৮ (শুক্রবার, ৮ই মে ১৯৩১) কবিবর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের বয়ঃক্রম সপ্ততি বৎসর পূর্ণ হইল | আমরা মনে করি যে, এই শুভঘটনা উপলক্ষ্য করিয়া, সমগ্র দেশবাসীর পক্ষ হইতে, কলিকাতা নগরীতে তাঁহার যথোচিত সংবর্দ্ধনা এবং একটি আনন্দোৎসবের অনুষ্ঠান করা কর্ত্তব্য |

ঐ সংবর্দ্ধনা ও তাহার আনুষঙ্গিক উৎসব-অনুষ্ঠানাদির ব্যবস্থা করিবার জন্য, আগামী ২রা জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৮ (শনিবার, ১৬ই মে, ১৯৩১), সন্ধ্যা ছয় ঘটিকার সময়, কলিকাতা ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট গৃহে একটি পরামর্শ সভার অধিবেশন হইবে | এই সভায় আপনার উপস্থিতি ও যোগদান প্রার্থনীয় |

ইতি৷ কলিকাতা, ২৫শে বৈশাখ, ১৩৩৮ |

 

চিঠির সঙ্গে আবেদনকারীদের স্বাক্ষর ছিল | তাঁরা হলেন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ |

জগদীশচন্দ্র বসু (১৮৫৮–১৯৩৭), প্রফুল্লচন্দ্র রায় (১৮৬১-১৯৪৪), রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় (১৮৬৫-১৯৪৩), রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (১৮৫৪-১৯৩৬), কামিনী রায় (১৮৬৪-১৯৩৩), যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত (১৮৮৫—১৯৩৩), বাসন্তীদেবী (১৮৮০-১৯৭৪), অবলা বসু (১৮৬৪-১৯৫১), সরলা রায় (১৮৫৯-১৯৪৬), নীলরতন সরকার (১৮৬১-১৯৪৩), প্রমথনাথ রায়চৌধুরী (১৮৭৩-১৯৪৯), আবুলকালাম আজাদ (১৮৮৮-১৯৫৮), ঘনশ্যামদাস বিড়লা (১৮৯৪-১৯৮৩), ব্রজেন্দ্রনাথ শীল (১৮৬৪-১৯৩৮), কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য (১৮৪০-১৯৩২), হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৮৫৩-১৯৩১), চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন (১৮৮৮-১৯৭০), হাসান সোহরাওয়ার্দী (১৮৮৪–১৯৪৬), শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬-১৯৩৮), বিধানচন্দ্র রায় (১৮৮২–১৯৬২), মোহাম্মদ আকরম খাঁ (১৮৬৮-১৯৬৮), প্রমথনাথ চৌধুরী (বীরবল) (১৮৬৮—১৯৪৬), হীরেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৬৮-১৯৪২), সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান (১৮৮৮–১৯৭৫), বিপিনচন্দ্র পাল (১৮৫৮-১৯৩২), চারুচন্দ্র ঘোষ (১৮৯০-১৯০৯), সুরেন্দ্রনাথ মল্লিক (১৮৭২-১৯৩৬), যতীন্দ্রনাথ বসু (১৯০৪-১৯২৯), সুভাষচন্দ্র বসু (১৮৯৭-?), দুর্গাচরণ সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ (১৮৬৬-১৯৪৮), কৃষ্ণকুমার মিত্র (১৮৫২-১৯৩৬), দেবপ্রসাদ সর্বাধিকারী (১৮৬২-১৯৩৫), শ্রীশচন্দ্র নন্দী (১৮৯৭-১৯৫২), ডব্লু, এস. আর্কহার্ট, জ্ঞানরঞ্জন বন্দোপাধ্যায় (১৮৬৯-১৯৩৮), হেরম্বচন্দ্র মৈত্র (১৮৫৭-১৯৩৮), আবুল কাশেম ফজলুল হক (১৮৭৩-১৯৬২), এইচ. এ. গিডনে, নগেন্দ্রনাথ বসু (১৮৬৬-১৯৩৮), দীনেশচন্দ্র সেন (১৮৬৬-১৯৩৯), জলধর সেন (১৮৬০-১৯৩৯), মুজিবুর রহমান (১৯২০–১৯৭৫), নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত (১৯১৬-১৯৮৪), আনন্দজী হরিদাস, সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত (১৮৮৭-১৯৫২), আর্থার থমাস মুর (১৮৩০-১৯১৩), ই. সি. বেনথল, সরোজিনীদেবী, ওঙ্কারমল জেটিয়া, নৃপেন্দ্রনাথ সরকার (১৮৭৬-১৯৪৫), এস. খুদাবক্স, হরিরাম গোয়েঙ্কা, অর্ধেন্দুকুমার গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৮১-১৯৭৪), পদ্মরাজ জৈন, জাহাঙ্গীর কৈয়াজী এবং শিবানন্দ (অধ্যক্ষ শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন) |

 

১৩৩৯ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ (১৯৩২ খ্রীষ্টাব্দ, ৮ মে) রবীন্দ্রনাথের ৭২তম জন্মদিনে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তেহেরানে | সেখানেই ধুমধাম করে পালিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন | যদিও এই উদযাপন হয়েছিল ২৫শে বৈশাখের ২দিন পূর্বে | ৬ মে, ১৯৩২ এদিনের অনুষ্ঠানের বর্ণনা দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথঃ

‘আজ ৬ ই মে | য়ুরোপীয় পঞ্জিকার মতে আজ আমার জন্মদিন | আমার পারসিক বন্ধুরা এই দিনের উপর সকাল বেলা থেকে পুষ্পবৃষ্টি করছেন | আমার চারি দিক ভরে গেছে নানাবর্ণের বসন্তের ফুলে, বিশেষত গোলাপে | উপহারও আসছে নানা রকমের | এখানকার গবর্মেন্ট থেকে একটি পদক ও সেই সঙ্গে একটি ফর্মান পেয়েছি | বন্ধুদের বললুম, আমি প্রথম জন্মেছি নিজের দেশে, সেদিন কেবল আত্মীয়েরা আমাকে স্বীকার করে নিয়েছিল | তার পরে তোমরা যেদিন আমাকে স্বীকার করে নিলে আমার সেদিনকার জন্ম সর্বদেশের—আমি দ্বিজ |...’

১৩৪২ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ (১৯৩৫ খ্রীষ্টাব্দ, ৮ মে) অনুষ্ঠান হয়েছিল শান্তিনিকেতনেঃ

প্রাচীন ভারতীয় প্রথানুসারে উৎসব আরম্ভ হয় | উদ্বোধন সঙ্গীতের পর পণ্ডিত বিধুশেখর শাস্ত্রী ও পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন সেন ঈশ্বরের আশীর্বাদ প্রার্থনা করে সংস্কৃত স্তোত্র পাঠ করেন | কবিগুরুকে পুষ্প, পুষ্পমালা প্রভৃতির অর্ঘ্য দান করা হয় | কবি কয়েকটি কথায় তাঁর মনের ভাব ব্যক্ত করেন | তিনি বলেন, “রাত্রির অন্ধকারকে দূরীভূত করিয়াই প্রভাতের আলোর আবির্ভাব |” প্রভাতের আলোর মত তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনও তাঁর অতীতের সমস্ত দ্বিধা ও সন্দেহকে ভুলিয়ে দেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন |

 

কবির ৭৫তম জন্মদিন উপলক্ষ্যে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ ২৯ বৈশাখ, ১৩৪২ (১৯৩৫ খ্রীষ্টাব্দ, ১২ মে) কবিকে সংবর্ধনা জানায় | এই ঘটনাটি ৩১ বৈশাখ (১৯৩৫, ১৪মে) আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ঃ

‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের পঞ্চসপ্ততিতম জন্মোৎসব উপলক্ষ্যে তাঁহাকে সম্বর্দ্ধনা করিবার জন্য গত রবিবার সন্ধ্যা ৭ ঘটিকার সময় বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদ কর্তৃক পরিষদ মন্দিরে একটি আনন্দোৎসবের অনুষ্ঠান হইয়াছিল | এতদুপলক্ষে সাহিত্য পরিষৎ মন্দির পুষ্পমাল্যে এবং আলোকমালায় সুসজ্জিত করা হইয়াছিল | কবিগুরু মন্দিরে উপস্থিত হইলে উপর হইতে তাঁহার উপর পুষ্পবৃষ্টি করা হয় |

কবিগুরু আসন গ্রহণ করিলে একটি উদ্বোধন সঙ্গীত হয় | অতঃপর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয় সাহিত্য পরিষদের পক্ষ হইতে রবীন্দ্রনাথকে চন্দনে ভূষিত করেন |’

 

১৩৪৫ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ (১৯৩৮ খ্রীষ্টাব্দের, ৮ মে) রবীন্দ্রনাথ ৭৮বর্ষে পদার্পণ করেছেন | সেই সময় হিটলার ও মুসোলিনির ঔদ্ধত্য সীমা ছাড়িয়েছে | ক্ষুব্দ রবীন্দ্রনাথ লিখলেনঃ

‘আমার জীবনের শেষ পর্বে মানুষের ইতিহাসে এ কী মহামারীর বিভীষিকা দেখতে দেখতে প্রবল দ্রুত গতিতে সংক্রামিত হয়ে চলেছে, দেখে মন বীভৎসতায় অভিভূত হল | এক দিকে কী অমানুষিক স্পর্ধা, আর-এক দিকে কী অমানুষিক কাপুরুষতা | মনুষ্যত্বের দোহাই দেবার কোনো বড়ো আদালত কোথাও দেখতে পাই নে |... পৃথিবীর তিন মহাদেশে—এই বিশ্বব্যাপী আশঙ্কার মধ্যে আমরা আছি ক্লীব নিষ্ক্রিয়ভাবে দৈবের দিকে তাকিয়ে—এমন অপমান আর কিছু হতে পারে না—মনুষ্যত্বের এই দারুণ ধিক্কারের মধ্যে আমি পড়লুম আজ ৭৮ বছরের জন্মবৎসরে |’

ঐদিন তাঁর জন্মবাসরে কবি রেডিওতে তাঁর লেখা এই কবিতা পাঠ করেনঃ

শুনি তাই আজি

মানুষ-জন্তুর হুহুংকার দিকে দিকে উঠে বাজি |

তবু যেন হেসে যাই যেমন হেসেছি বারে বারে

পণ্ডিতের মূঢ়তায়, ধনীর দৈন্যের অত্যাচারে,

সজ্জিতের রূপের বিদ্রূপে | মানুষের দেবতারে

ব্যঙ্গ করে যে অপদেবতা বর্বর মুখবিকারে

তারে হাস্য হেনে যাব, বলে যাব, ‘এ প্রহসনের

মধ্য-অঙ্কে অকস্মাৎ হবে লোপ দুষ্ট স্বপনের;

নাট্যের কবররূপে বাকি শুধু রবে ভস্মরাশি

দগ্ধশেষ মশালের, আর অদৃষ্টের অট্টহাসি |’

বলে যাব, ‘দ্যূতচ্ছলে দানবের মূঢ় অপব্যয়

গ্রন্থিতে পারে না কভু ইতিবৃত্তে শাশ্বত অধ্যায় |’

১৩৪৭ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ (১৯৪০ খ্রীষ্টাব্দ, ৮ মে) রবীন্দ্রনাথ ৮০ বছরে পদার্পণ করলেন | ১৩৪৭ এর পয়লা বৈশাখ জন্মদিনের অনুষ্ঠান হলো শান্তিনিকেতনে | সেদিন ছিল ১৪ এপ্রিল | ১৫ এপ্রিল আনন্দবাজারে প্রকাশিত হয়ঃ

‘নববর্ষের পুণ্য প্রভাতে নবজীবনের আহ্বান

পৃথিবীর ঘোর দুর্দিনে শান্তির অভয়বাণী

শান্তিনিকেতনে নববর্ষ অনুষ্ঠানে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভাষণ

কবির জন্মোৎসবে মার্শাল চিয়াং কাইসেকের অভিনন্দন।’

অদ্য প্রাতে শান্তিনিকেতনে নববর্ষের আনন্দ উৎসব সুচারু ও সুন্দররূপে সম্পন্ন হইয়াছে | কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং তাঁহার শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও উৎসবে পৌরোহিত্য করিয়া আশ্রমবাসীদের অন্তর উৎসাহে ও আনন্দে উদ্দীপ্ত করিয়া তোলেন | নববর্ষ উপলক্ষ্যে আশ্রম সর্বদিনব্যাপী উৎসব কোলাহলে মুখরিত হইয়াছিল | উৎসবের বিবরণ—সর্বপ্রথমে ভোর সাড়ে চার ঘটিকায় আশ্রমের বালক-বালিকারা একটি বৈতালিক দল বাহির করে এবং ‘আঁধার রজনী পোহালো, জগৎ ভরিল পুলকে’ এই সঙ্গীতটি সমবেতকণ্ঠে গাহিয়া আশ্রমের চতুর্দিক প্রদক্ষিণ করে এবং সূর্য্যোদয় হইলে পর বৈতালিক গান সমাপ্ত হয় |

 

অতঃপর প্রত্যূষে সাড়ে ছয় ঘটিকায় আশ্রম-মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি শুরু হইলে আশ্রমবাসীরা ও অতিথি অভ্যাগতবৃন্দ দলে দলে মন্দিরে উপাসনায় যোগদানের জন্য সমবেত হন | প্রবেশদ্বারে একটি বালক ও একটি বালিকা সকলের কপালে চন্দন লেপন করিয়া দিতেছিল | মন্দিরের অভ্যন্তরে শিল্পী শ্রীযুক্ত নন্দলাল বসু ও তাঁহার ছাত্রছাত্রীদল আলিপনা অঙ্কিত করিয়া তাহাতে শুভ্র পুষ্প ও মঙ্গল-ঘট সাজাইয়া রাখেন; ধূপের গন্ধে চারিদিক আমোদিত হইয়া উঠে | মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি অবসানের পর কবিগুরু উত্তরায়ণ হইতে মোটরে করিয়া আসিয়া মন্দিরের সামনে অবতরণ করিলে আশ্রমবাসী বিনম্র শ্রদ্ধার সহিত দণ্ডায়মান হইয়া তাঁহাকে অভিনন্দন জ্ঞাপন করে | প্রায় প্রত্যহই রাত্রে তাঁহার অল্প অল্প জ্বর হয় বলিয়া কবিকে অত্যন্ত ক্লান্ত দেখাইতেছিল | কবি মন্দিরের অভ্যন্তরে সুসজ্জিত বেদীতে উপবেশন করিলে শাঁখ বাজিয়া ওঠে | জনৈক আশ্রম-কন্যা তাঁহাকে মাল্যচন্দনে ভূষিত করে | পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন সেন শাস্ত্রী মহাশয় প্রথমে উপনিষদের মন্ত্রোচ্চারণের পর গানের দল

‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।

তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।।’

এই গানটি করেন |

৮০ বছরের জন্মদিনে চীন জাতীয় সরকারের আইন সভার সভাপতি ড. এইচ.এইচ কুং-এর কাছ থেকে রবীন্দ্রনাথ একটি অভিনন্দন বার্তা পান |

৮০ বছরের জন্মদিন উপলক্ষ্যে একটি কবিতা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ (জন্মদিনে ৫ সংখ্যক কবিতা) | এই কবিতায় তিনি লিখলেনঃ

জীবনের আশি বর্ষে প্রবেশিনু যবে

এ বিস্ময় মনে আজ জাগে—

লক্ষকোটি নক্ষত্রের

অগ্নিনির্ঝরের যেথা নিঃশব্দ জ্যোতির বন্যাধারা

ছুটেছে অচিন্ত্য বেগে নিরুদ্দেশ শূন্যতা প্লাবিয়া

দিকে দিকে,

তমোঘন অন্তহীন সেই আকাশের বক্ষস্থলে

অকস্মাৎ করেছি উত্থান

অসীম সৃষ্টির যজ্ঞে মুহূর্তের স্ফুলিঙ্গের মতো

ধারাবাহী শতাব্দীর ইতিহাসে৷...

 

 

৮০ বছর বয়সে এসে আর একটি বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডব প্রত্যক্ষ করলেন রবীন্দ্রনাথ | ক্ষুব্ধও অসন্তুষ্ট রবীন্দ্রনাথ ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ১৫ জুন আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে একটি তার পাঠালেনঃ

‘Today, we stand in awe before the fearfully destructive force that has so suddenly swept the world. Every moment I deplore the smallness of our means and the feebleness of our voice in India, so utterly inadequate to stem, in the least, the tide of evil that has menaced the permanence of civilization.

All our individual problems of Politics today have merged into one supreme world Politics, which, I believe, is seeking the help of the United States of America as the last refuge of the spiritual man, and these few lines of mine merely convey my hope, even if unnecessary, that she will not fail her mission to stand against the Universal disaster that appears so imminent.’

১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ১লা বৈশাখ (১৯৪১ খ্রীষ্টাব্দ, ১৪ এপ্রিল) রবীন্দ্রনাথ ৮১ বছরে পদার্পণ করতে চলেছেন | নববর্ষের প্রথম দিন বর্ষবরণ ও রবীন্দ্র জন্মোৎসব একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় | রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ নববর্ষ | তাঁর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত শেষ জন্মোৎসব | প্রভাতে আশ্রমের বালক-বালিকাদের সমস্বরে বৈতালিক গানে আশ্রম এর পরিবেশ মুখরিত হয়ে ওঠে | সূর্যোদয়ের পূর্বে মন্দিরে হয় উপাসনা | অধ্যাপক ক্ষিতিমোহন সেন আচার্যের আসন গ্রহণ করেন | এই অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে কবিগুরু রচিত দুটি গান গীত হয় | রবীন্দ্রনাথের এদিনের জন্মোৎসবের ভাষণ ছিল ‘সভ্যতার সংকট |’ কবির উপস্থিতিতে এটি পাঠ করে শোনান ক্ষিতিমোহন সেন | এই বছর ২৫শে বৈশাখও শান্তিনিকেতনে অনাড়ম্বর পরিবেশে তার জন্মদিন পালন হলো | জন্মদিন উপলক্ষ্যে তিনি একটি কবিতা লেখেনঃ

‘আমার এ জন্মদিন-মাঝে আমি হারা,

আমি চাহি বন্ধুজন যারা

তাহাদের হাতের পরশে

মর্তের অন্তিম প্রীতিরসে

নিয়ে যাব জীবনের চরম প্রসাদ,

নিয়ে যাব মানুষের শেষ আশীর্বাদ |

শূন্য ঝুলি আজিকে আমার;

দিয়েছি উজাড় করি

যাহা-কিছু আছিল দিবার,

প্রতিদানে যদি কিছু পাই—

কিছু স্নেহ, কিছু ক্ষমা—

তবে তাহা সঙ্গে নিয়ে যাই

পারের খেয়ায় যাব যবে

ভাষাহীন শেষের উৎসবে |

(‘শেষ লেখা’ ১০ নং কবিতা / ৬মে, ১৯৪১)

১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ জন্মদিন | সত্যদ্রষ্টা কবি উপলব্ধি করেছিলেন কালের অমোঘ নিয়মে এই জীর্ণ শরীর ছেড়ে পাড়ি দিতে হবে অনন্তলোকে | তাই কবিতার শেষে লিখলেনঃ ‘ভাষাহীন শেষের উৎসবে |...’ কবিকে আমরা হারিয়েছি ৮০ বছর পূর্বে | কিন্তু আজ ১৬১তম জন্মদিনে আমরা উপলব্ধি করতে পারছি তিনি সদাজাগ্রত আমাদের প্রত্যেকের হৃদয়ে | আমাদের জীবনের প্রতি মুহূর্তে তাঁর অনিবার্য উপস্থিতি |

‘২৫শে বৈশাখ’ প্রবহমান কাল স্রোতে কখনোই হারিয়ে যাবে না | যতদিন পৃথিবীর অস্তিত্ব থাকবে ততদিন আমাদের অন্তরে অন্তরে থাকবেন রবীন্দ্রনাথ, আর প্রতি ‘পঁচিশে বৈশাখ’-এ আমরা গানের মধ্য দিয়ে আমাদের ‘হৃদয় দেবতা’ রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করবোঃ

হে নূতন,

দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ ॥

তোমার প্রকাশ হোক কুহেলিকা করি উদ্ঘাটন

সূর্যের মতন |

রিক্ততার বক্ষ ভেদি আপনারে করো উন্মোচন |

ব্যক্ত হোক জীবনের জয়,

ব্যক্ত হোক তোমামাঝে অসীমের চিরবিস্ময় |

উদয়দিগন্তে শঙ্খ বাজে, মোর চিত্তমাঝে

চিরনূতনেরে দিল ডাক

পঁচিশে বৈশাখ॥

 

(ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী, রাষ্ট্রপতি-পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও রবীন্দ্র গবেষক )

ছবি সংগৃহীত

Mailing List