একটি পুরাণভিত্তিক ধর্মীয় ধারাবাহিক ‘আমিই সে’/ দ্বাদশ পর্ব

একটি পুরাণভিত্তিক ধর্মীয় ধারাবাহিক ‘আমিই সে’/ দ্বাদশ পর্ব
19 Sep 2021, 06:25 PM

‘আমিই সে’

 (একটি পুরাণভিত্তিক ধর্মীয় ধারাবাহিক রচনা)

  

সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

 

দ্বাদশ পর্ব

 

 মার্কন্ডেয় বালক-রূপী জগৎবন্ধু শ্রীহরির মুখবিবরে প্রবেশ করে পার্থিব জগতের সব কিছুই তার পেটের মধ্যে দেখতে পেয়ে, একসময় তার থেকে মুক্তি লাভের আশায় পুরুষোত্তমের শরণ নিয়ে স্তুতি করতে লাগল।

 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে: কে এই ব্যক্তি?? যে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরও জীবিত অবস্থায় জলমগ্ন হয়ে ভেসে বেড়াতে পারে!!! এটা খুবই স্বাভাবিক যে মহাপ্রলয়কালের পর ধরাতলে কোনো জীবিত সত্ত্বা থাকার কথা নয়; তা সত্ত্বেও মার্কন্ডেয়র প্রাণ-সত্ত্বার অস্তিত্ব ছিল কি কারণে?

 

 এর উত্তর জানতে গেলে আমাদের যেতে হবে অতি প্রাচীন এক ইতিহাসে। ৠষি ভৃগুর বংশধর ছিলেন মার্কন্ডেয়। বাবা মৃকন্ডু ঋষি ও মরুদবতী। তৎকালীন সমাজের এক প্রতিষ্ঠিত ঋষিপুরুষ ও পরম সাত্ত্বিক দৈব-সত্ত্বা-যুক্ত ভৃগুর বংশোদ্ভূত হবার কারণে মৃকন্ডু পরম ধার্মিক ও নিষ্ঠাবান তো ছিলেন-ই, তার সঙ্গে তার পত্নী মরুদবতী-ও নিষ্ঠা-বতী, স্বাধ্বী ও ভক্তিমতী নারী ছিলেন।

 

উভয়েই প্রাচীন রীতিনীতি মেনে একান্তই তৎগতচিত্তে ঈশ্বরচিন্তা করতেন। তাঁরা ইষ্টরূপে শিবের উপাসনা করে ধ্যানমার্গের অনেক উঁচুতে অবস্থান করতে লাগলেন। দিন যায়, বছর গড়ায় .....

ক্রমে সংসার-ধর্মের স্বাভাবিক নিয়মেই বংশরক্ষার্থে সন্তান কামনা করলেন সদাশিব ভোলানাথের সন্নিকটে। সাধু ব্যক্তির সাধু কামনা--- সন্তান যেন পুত্রই হয়; কিন্তু সে যেন ভবিষ্যতে জ্ঞানী ও পন্ডিত হয়।

প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে অখিলভূবনের সৃষ্টি-কারী শিব স্নেহভরে তাদের জানালেন: জ্ঞানী পুত্রের জনক-জননী-ই তারা হতে পারবে, কিন্তু সে হবে ক্ষণজীবী --- অতি অল্প সময়ের আয়ু হবে তার।

 

উত্তরে ভাবীকালের জনক-জননী জানিয়েছিলেন, তাদের দীর্ঘজীবী মূর্খ পুত্র চাই না, পুত্র ক্ষণজীবী হোক, কিন্তু সে যেন ভবিষ্যতে জ্ঞানী হয়। সদাশিব সন্তুষ্ট হয়ে সেই বর দিয়েছিলেন; ক্ষণজীবী সেই পুত্রই এই মার্কন্ডেয়।

 

তার আয়ু ছিল মাত্র ষোল বছর। শিবের বরে সে তার বাবা-মাকে খুশি করে জন্ম- লাভ করলেও নিয়তির বিধানে ষোল বছরের বেশি এক মুহূর্তেও পৃথিবীতে থাকবার অনুমতি ছিল না তার।

শিক্ষা, ধর্ম-জ্ঞান, শিষ্টাচার, অধ্যয়ন, ধী-শক্তি --- সব কিছুতেই পারঙ্গম হয়ে উঠলেও, মহাকালের অমোঘ নিয়মে সময় এগোতে এগোতে ষোল বছর পূর্তির দিন এসে হাজির হল। মার্কন্ডেয় পরম ভক্ত ছিল শিবের। মন-প্রাণ দিয়ে সে আরাধনা করত তাঁর।

সেদিনও ব্যতিক্রম হল না তার। জীবনের অন্তিম দিনে নিজে হাতে করে শিবের মূর্তি গড়ে --- পুজোর আসনে বসে ধ্যান-মগ্ন ছিল সে। ওদিকে কালান্তক যম-ও তার কর্তব্য-হেতু মর্তধামে মার্কন্ডেয়র জীবাত্মা গ্রহণ করতে এসেছে।

কিশোর মার্কন্ডেয়কে সে তার কর্তব্যর কথা জানিয়ে শরীর ত্যাগ করে সূক্ষ্ম রূপে স্বধামে যাবার জন্য অনুরোধ করল। মার্কন্ডেয় যমের সাথে যেতে নারাজ; কারণ তার শিব-পূজা তখনও সমাপ্ত হয়নি।

 

যম-ও অনুনয় করে বোঝানোর চেষ্টা করে যেতে লাগল এই বলে যে, জগতের সৃষ্টির কারণে সব আত্মাকেই পরমাত্মার অমোঘ নিয়মে ও নির্দেশে কোনো না কোনো জীবের শরীর ধারণ করে মরলোকে আসতে হয়। আর তার নির্দিষ্ট কাজ-কর্মাদির সমাপন হলে ঐ জগদীশ্বরেরই নির্দেশে আবার পরমাত্মার কাছে ফিরে যেতে হয়। এর অন্যথা হবার নয়।

সেটাই সৃষ্টির অমোঘ নিয়ম।

কিন্তু মার্কন্ডেয় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, শিবকে ছেড়ে কিছুতেই সে যমের সাথে যাবে না। ওদিকে যমও নিরুপায়, জগৎ-পতি ঈশ্বরের কঠোর নিয়মে সেই দিন-ই তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে পরপারে, লোক-চক্ষুর অন্তরালে  --- পরমাত্মার কাছে অমৃতলোকে।

 

যম নাছোড়বান্দা হয়ে পীড়াপীড়ি করতে লাগলে মার্কন্ডেয় কাতর-স্বরে শিবকে ডাকতে লাগল, ওদিকে যমও তার রজ্জু (দড়ি) দিয়ে তাকে বন্ধন করে ফেলল। মার্কন্ডেয় তখন ঐ শিবলিঙ্গকে আঁকড়ে ধরে দেবাদিদেব শিবের সাহায্য প্রার্থনা করতে লাগল।

(চলবে)

ads

Mailing List