একটি পুরাণভিত্তিক ধর্মীয় ধারাবাহিক রচনা ‘আমিই সে’ / একাদশ পর্ব

একটি পুরাণভিত্তিক ধর্মীয় ধারাবাহিক রচনা ‘আমিই সে’ / একাদশ পর্ব
05 Sep 2021, 03:17 PM

‘আমিই সে’

(একটি ধর্মীয় ধারাবাহিক রচনা)

সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

 

একাদশ পর্ব

 

মার্কন্ডেয় অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন ওই বটগাছের শাখায় সোনার পালঙ্ক নানান ধরনের বহুমূল্য রত্নরাজিতে সুসজ্জিত; বহু আবরণে আচ্ছাদনে আচ্ছাদিত। অদ্ভুত চোখধাঁধানো স্বর্গীয় আলোকচ্ছটা চতুর্দিকে উজ্জ্বলতা দান করেছে।

 

ঘন কালো জগৎ-সংসারে ওই আলোকচ্ছটা দিক্-চক্রবাল উজ্জ্বল আলোকে আলোকিত করে রেখেছে; ওই রত্নখচিত পালঙ্কের ওপর অধিষ্ঠান করে আছেন বাল-কৃষ্ণ ----- বালক রূপে শ্রীকৃষ্ণ।

 

তাঁর শরীর থেকে চোখ ঝলসানো কোটি সূর্যের দীপ্তি বিচ্ছুরিত হচ্ছে। চতুর্ভুজ তিনি, ধারণ করে আছেন শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম। দুটি আয়তাকার চোখ পদ্মপাতার মত ক্ষমা-সুন্দর।

 

বক্ষস্থলে শ্রীবৎসের পায়ের ছাপ, গলায় বনমালা, নানান দিব্য রত্নমালা পরিধান করে আছেন। জগৎ-সংসারে পরিব্যাপ্ত অনন্ত-বিস্তৃত জলমধ্যে কি রকম নির্ভয়ে, পরম নিশ্চিন্তে ওই স্বর্ণ-পালঙ্কে বিরাজ করে আছেন!!!

 

মার্কন্ডেয় মনে মনে ভাবতে লাগল: আমি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত বিষয়ে অভিজ্ঞ, পরম জ্ঞান-সম্পন্ন বেদজ্ঞ ৠষি, আমি কেন জানতে পারছি না ওর স্বরূপ!!! আর কোন শক্তি বলে ওই- টুকু বালক পরম নিশ্চিন্ত মনে অখিলভূবনের অখণ্ড জলরাশির ওপরে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে!!!

 

আসলে দৈবী মায়ায় মার্কন্ডেয় অন্ধ হয়ে ছিল। অহং-পাশে বদ্ধ থাকায় জগৎ-বল্লভ শ্রীহরিকে সে চিনতে পারল না।

 

নিজের নির্বুদ্ধিতায় সে তখন নিজেকেই তিরস্কার করতে লাগল। জলে ভাসতে ভাসতে সে তখন আবার ভালো করে ওই বালকটিকে নজর করার চেষ্টা করল, কিন্তু বালকটির শরীর থেকে এতটা তেজ, তথা আলোকচ্ছটা বিচ্ছুরিত হচ্ছিল, যে মার্কন্ডেয় তার দিকে ভালোকরে তাকাতেই পারছিল না।

 

শিশু-রূপী অন্তর্যামী জনার্দন স্মিত হাস্যে মেঘের মত গম্ভীর কন্ঠে মার্কন্ডেয়কে বললেন, "ভোঃ মার্কন্ডেয়, আমি জানি তুমি ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে বর্তমান অবস্থা থেকে মুক্তি লাভের জন্য আমার শরণাপন্ন হয়েছ; তুমি অনতিবিলম্বে আমার শরীরে প্রবেশ কর। এবং তাতেই তোমার বিশ্রাম-লাভ ঘটবে।"

 

এই কথা বলা সম্পূর্ণ করে শ্রীহরি তাঁর শ্রীমুখ-বিবর উন্মোচন করলেন। অনন্ত-বিস্তৃত জলমধ্যে মহাসসলিলমধ্যে আবদ্ধ কিংকর্তব্যবিমূঢ় মার্কন্ডেয় অনোন্যপায় হয়ে মোহাবিষ্টের মতো বিবশ হয়ে জগৎবন্ধু শ্রীহরির মুখবিবরে প্রবেশ করল।

মুখের ভিতরে প্রবেশ করে ক্রমে সে বালকের উদরের ভিতরে প্রবেশ করল। সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করল উদরমধ্যে নানা জনপদে সুসজ্জিত সমগ্র পৃথিবী, সাত সমুদ্র, পাহাড় পর্বত-সমূহ দেখতে পেল।

 

সুমেরু পর্বত ও নানান রত্নখচিত কন্দর, গুরুদেব গুহা --- এমনকি নানা মুনির তপস্যা-রত অবস্থায়--- সবকিছুই সে অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করল।

 

গাছপালা, পশুপাখি, নদী-নালা, সাধারণ মানুষ-জন, এমনকি হিমালয়, বিন্ধ, কৈলাশ, গন্ধমাদন, মৈনাক পর্বত দেখতে পেল। পৃথিবীর সমস্ত তীর্থস্থান, গ্রাম, শহর, কৃষি-ক্ষেত্র, বানিজ্য, কেনাবেচা----- প্রভৃতি সব কিছুই মার্কন্ডেয় ওই বালকের পেটের মধ্যে থাকা অবস্থায় দেখতে পেল।

এককথায়, ব্রহ্ম থেকে তৃণ--- সবকিছুই সে দেখতে পেল । ধীরে ধীরে সে বালকের উদরস্থ সকল

অঞ্চল, তথা জগৎ পরিভ্রমণ করল, কিন্তু ওই শরীর থেকে বার হবার কোনো পথ খুঁজে পেল না।

 

নিরুপায় হয়ে সে তখন পরম পুরুষোত্তমের শরণ নিল। করজোড়ে পরম ঈশ্বরকে বলল, "হে জগত্তারণ শ্রীহরি, পরম পিতা ও পরম পালক, তুমি করুণাময়। কৃপা করে তুমি এই মহাপৃথিবীরূপ, তথা তোমার শরীর থেকে  নির্গত কর।"

(চলবে)                             

ads

Mailing List