একটি পুরাণভিত্তিক ধর্মীয় ধারাবাহিক রচনা ‘আমিই সে’ / অষ্টম পর্ব

একটি পুরাণভিত্তিক ধর্মীয় ধারাবাহিক রচনা ‘আমিই সে’ / অষ্টম পর্ব
18 Jul 2021, 01:33 PM

‘আমিই সে’ 

 

(একটি পুরাণভিত্তিক ধর্মীয় ধারাবাহিক রচনা)

 

সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

 

অষ্টম পর্ব

'আমার এই জন্মে হস্ত-পদের দ্বারা কৃত অপরাধ, বাক্যজ, শরীরজ, কর্মজ, শ্রবনজ, নয়নজ কিংবা মানস অপরাধ, সঞ্চিত কিংবা ভবিতব্য অপরাধ--- সব ক্ষমা কর। হে করূণা-সাগর, হে মহাদেব, শম্ভু--- তোমার জয় হোক। (শিবাপরাধক্ষমাপনস্ত্রোত্র)

 

'হে স্বপ্রকাশ উমাপতি, তুমি দেবতাদেরও গুরু, তোমাকে বন্দনা করি, সর্পভূষণ, মৃগধরকে বন্দনা করি। হে পশুপতি, তুমি চন্দ্র, সূর্য ও বহ্নিরূপ ত্রিনয়নধারী এবং মুকুন্দপ্রিয়, তোমাকে বন্দনা করি। ভক্তদের আশ্রয়,  বরদাতা, হে মঙ্গলময় মহাদেব, তোমাকে বন্দনা করি।'

 

পুরাকালে, যখন মহাপ্রলয়কাল উপস্থিত হল, তখন চারিদিকে ঘন অন্ধকার ছেয়ে গেল। সূর্য, চন্দ্র তাদের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলল। সমগ্র বিশ্ব চরাচরের ওপরে যেন পুরু আঁধারের আবরণে ঢাকা পড়ে গেল। দৃষ্টি আর কোনো জীবিত সত্ত্বার অধীন রইল না; পরস্পর পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। বিরাজ করল তখন জঘন্যতম কীট, অনিষ্ট ঈতর শ্রেণীর জীবকূল ---- যারা অন্ধকারের বাসিন্দা ।

 

ঠিক ওই সময়েই আকাশে পরিব্যাপ্ত হল প্রলয়কালীল আদিত্য, সেই সঙ্গে সমগ্র জগৎ-সংসারে ধ্বনিত হল অতি প্রচন্ড গর্জন। আকাশে নিনাদিত হতে লাগল বজ্রনাদ, সাথে ঘন ঘন বিদ্যুতের সর্বগ্রাসী লেলিহান শিখা।

 

ঐ ভয়াবহ আদিত্যর উত্তাপে গাছ-পালা, পাহাড়-পর্বত ---- সবকিছুই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল; মানুষ কাতারে কাতারে মারা যেতে লাগল। বড়ো বড়ো উল্কাপাত (আগুনের গোলা) হতে শুরু করল।

 

ঐ অগ্নি গোলকের আক্রমণে সমুদ্র, নদী, বড়ো বড়ো জলাশয়--- সব শুকিয়ে গেল। দিন-রাত ঐ প্রলয়ঙ্কারী সূর্যের উত্তাপে সৃষ্টি হল ঘূর্ণাবর্ত অতি প্রচন্ড বায়ুর বেগ, যার কারণে ঐ সর্ব- গ্রাসী উত্তাপ পরিণত হল আগুনে--- যা ধীরে ধীরে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল।

 

ওই আগুন ক্রমে মাটির নিচে, পাতালেও প্রবেশ করে সেখানকার সব প্রাণীকূলকেও ধ্বংস করল।

 

অনুমানের অতীত: একটি মাত্র সূর্যের উত্তাপে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ে, কমে। ঐ প্রলয়ঙ্কারী আদিত্যর উপস্থিতি কোটি কোটি সূর্যের সঙ্গে তুলনা করা চলে; ঐ অগ্নির নাম সম্বর্তক এবং তা সমগ্র ত্রিভুবনকে পুড়িয়ে ছাই করে দিল।

সমগ্র জীবিত-সত্ত্বা, তথা পশু-পাখী, মানবকূল ----- সবকিছুই পুড়িয়ে খাক করে দিল। এহেন অবস্থায় একমাত্র পরমধর্মী, মহর্ষি মার্কন্ডেয় স্থির হয়ে ধ্যানমগ্ন ছিলেন।

 

হঠাৎ, ধ্যান ভঙ্গ করে লক্ষ্য করলেন ঐ সম্বর্তক আগুনের লেলিহান শিখার অনির্বাণ রূপ ও তার উত্তাপে তাঁর তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে গেল।

 

তিনিও ঐ প্রলয়ঙ্কারী অগ্নি বলয় দর্শন করে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন এবং প্রায় অচেতন হয়ে পড়লেন; কি করে ঐ অবস্থা থেকে তিনি মুক্তি পাবেন, ভাবতে ভাবতে বিভিন্ন স্থান ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। কিন্তু এহেন আপৎকালীন অবস্থা থেকে মুক্তিলাভের উপায় নির্ধারণ করতে না পেরে তৎগতচিত্তে সনাতন, পুরুষোত্তম, ও শ্রেষ্ঠ দেবতাকে এক মনে স্মরণ করতে লাগলেন।

 

ঐ ভাবে ঘুরতে ঘুরতে পরমপ্রিয় পরমেশ্বরের স্মরণ করতে করতে হঠাৎ-ই এক এক বিশাল বটগাছের দর্শন পেলেন। তিনি নানাস্থানে ভ্রমণ করতে করতে এতটাই ক্লান্ত হয়ে পরেছিলেন যে, ঐ গাছের নীচে গিয়ে বসে পড়লেন।

 

অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন: ঐ বটগাছের নিচে অবস্থান করার পর আর সম্বর্তক আগুনের ভয়, অগ্নি বর্ষণ,  কিংবা বজ্রপাত--- কোনো কিছুরই লেশমাত্র আর বোধ হচ্ছে না ।

 

এভাবে গাছের নীচে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ খেয়াল করলেন আকাশে ঘন মেঘের সমারোহ, এবং তা বিভিন্ন আকারে সারা পরিমন্ভল ছেয়ে গেল । ঘন ঘন বিদ্যুতের আঘাতে আকাশ যেন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যেতে লাগল।

 

(চলবে)

ads

Mailing List