পঙ্গপালের একটি দল দিনে ৩৫ হাজার মানুষের খাদ্যশস্য নষ্ট করে! পঙ্গপালের পেটে এত খিদে?

পঙ্গপালের একটি দল দিনে ৩৫ হাজার মানুষের খাদ্যশস্য নষ্ট করে! পঙ্গপালের পেটে এত খিদে?
23 Jan 2022, 12:45 PM

পঙ্গপালের একটি দল দিনে ৩৫ হাজার মানুষের খাদ্যশস্য নষ্ট করে! পঙ্গপালের পেটে এত খিদে?

 

সুমন প্রতিহার

 

 ২০১৮, এম্প্টি কোয়াটার বা রাব আল খালি। আরব পেনিনসুলার মরুভূমির শুষ্কতম অংশ।

 

বছরে বৃষ্টিপাত ৩৫ মিলিমিটার। দিনে পঞ্চাশ ডিগ্রি তাপমাত্রা। জীববৈচিত্র্য বলতে কিছু গাছ ও বিছে জাতীয় প্রাণী, সঙ্গে স্তন্যপায়ী ইঁদুর। এমনই জনমানবহীন মরুভূমি অঞ্চলে হঠাৎ অপ্রত্যাশিত বৃষ্টিপাত। লোকচক্ষুর আড়ালে বালির সামান্য নীচে দু ইঞ্চি গর্ত করে, ৫০ টি ডিম লুকিয়ে রাখল। বদলে যাওয়া আবহাওয়ার সুযোগ নিয়ে প্রায় নয় মাস, তিন প্রজন্ম ধরে পঙ্গপাল ফুলে ফেঁপে উঠলো। চূড়ান্ত সংখ্যা বৃদ্ধির পর খাবারের খোঁজে দঙ্গল বেঁধে আরবসাগর পেরিয়ে আফ্রিকায়। আফ্রিকা তখন সবুজ।

২০১৯, হর্ন অফ আফ্রিকা। ইথিওপিয়া ও সোমালিয়ায় বিস্তীর্ণ অঞ্চল।

পঙ্গপালের যে দল এখন পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে হয়ে রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশেও হানা দিয়েছিল তারা সবাই রাব আল খালিতে বেড়ে ওঠা পঙ্গপালের বংশোদ্ভূত। পশ্চিম ভারত মহাসাগরের অস্বাভাবিক জলবায়ুর প্রভাবে পূর্ব আফ্রিকাতেও আচমকা বেশি বৃষ্টিপাত হলো। সেই সুযোগে পঙ্গপাল-রা নিজেদের সংখ্যা এবং আকার প্রায় কুড়ি গুন বাড়িয়ে প্রস্তুতি নিলো। বিশ্ব জলবায়ুর গতিপ্রকৃতি অচেনা, মরুভূমি অঞ্চলের বৃষ্টিপাত অস্বাভাবিক। ভারত মহাসাগরের জল বেশি তপ্ত।

 

ইন্ডিয়ান ওশেন ডাইপোল, সংক্ষেপে আইওডি বা ইন্ডিয়ান নিনো। পর্যায়ক্রমিকভাবে পজিটিভ, নিউট্রাল ও নেগেটিভ ডাইপোল সৃষ্টির মাধ্যমে পশ্চিম ভারতসাগর ও পূর্ব ভারতসাগরের জল গরম বা ঠান্ডা হওয়ার মধ্যে দিয়েই আফ্রিকা, আরব, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়ার বৃষ্টিপাত প্রভাবিত হয়। বিগত ত্রিশ বছরে পজিটিভ এবং নেগেটিভ ডাইপোল চারবার করে পরিবর্তিত হয়েছে যার একটির স্থায়িত্ব ছয় মাস।

২০০৬ থেকে ২০০৮ তিন বছরে পরপর তিনটি পজিটিভ ডাইপোলের ঘটনা ঘটে যা বিজ্ঞানে অত্যন্ত বিরল। প্রতি এক হাজার বছরে মাত্র দুবার হবার সম্ভাবনা। ভারত মহাসাগরে অতিরিক্ত পজিটিভ ডাইপোল এর প্রভাবে তৈরি হচ্ছে অনাহুত বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড় ও ভয়ংকর বন্যা পরিস্থিতি। পজিটিভ ডাইপোল এর প্রভাবে আফ্রিকা ও আরব পেনিনসুলা জুড়ে বৃষ্টি হয় আবার পূর্বদিকে অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় শুষ্কতা বাড়ে। ২০১৮ সালে পজিটিভ ডাইপোল এর উষ্ণতার পার্থক্য দাঁড়ায় দুই ডিগ্রী। যার ফলে আরব পেনিনসুলা অঞ্চলে ঝাঁপিয়ে বৃষ্টি হয়। আর বৃষ্টির সুযোগ নিয়েই আজকের পঙ্গপালের পূর্বপুরুষদের বাড়বাড়ন্ত। বদলে যাওয়া জলবায়ুর কারণে পৃথিবীর শুষ্কতম অঞ্চল গুলোতে বৃষ্টিপাতের ঘটনা ঘটছে, এই পরিবর্তনে বাড়ছে পঙ্গপালের মতো পতঙ্গদের সংখ্যা। ভারতবর্ষের রাজস্থানের মরুভূমিতেও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে পঙ্গপালের ডিম পাড়া, প্রজনন করার আদর্শ আবহাওয়া তৈরি। 

 

গঙ্গাফড়িং জাতীয় পতঙ্গদের বংশবৃদ্ধি ঘটিয়ে দলবদ্ধভাবে স্থানান্তরিত হওয়ার ঘটনাকে লোকাস্ট সোয়াম বলে। পৃথিবীতে প্রায় আট হাজার প্রজাতির ফড়িং দেখা যায়। তার মধ্যে মাত্র ১২ টি প্রজাতি পঙ্গপালে রূপান্তরিত হয়। যারা পরিযানে সক্ষম। দলবদ্ধ থাকা অবস্থায় পতঙ্গদের মাথায় কিছু নির্দিষ্ট দিক নড়েচড়ে বসে, সঙ্গে সেরোটোনিন ক্ষরণ শুরু হয়। সেই সময় পতঙ্গ গুলি পেছনের পা দিয়ে অন্যান্য পতঙ্গকে উত্তেজিত করতে শুরু করে।

দলবদ্ধ পঙ্গপালের উপস্থিতি ও গন্ধ পরস্পরকে কাছাকাছি নিয়ে আসে। শুরু হয় স্থানান্তরের প্রস্তুতি। গবেষণা দেখিয়েছে, সেরোটোনিন প্রয়োগের মাধ্যমে একলা থাকা নিরীহ ফড়িংকে নিমেষে পঙ্গপালের দলে ভিড়ে যেতে। এই সেরোটোনিন মানবদেহের অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। হতাশা থেকে উচ্ছ্বাস সবই সেরোটোনিন ক্ষরণের উপর নির্ভরশীল। নিতান্ত নিরীহ ফড়িংয়ের পঙ্গপাল হয়ে ওঠা এবং দলবদ্ধভাবে পরিযান করার ঘটনা খাটো শিং যুক্ত ডেসার্ট লোকাস্টে সব থেকে ভাল দেখা যায়। এই পতঙ্গ গুলিকে মডেল হিসেবে ব্যবহার করে পঙ্গপালদের পরিযানের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশ হয়েছিলো সায়েন্স পত্রিকাতে, ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিফেন রোজার দেখিয়ে দিলেন কেমন করে সেরোটোনিন ফড়িং এর ব্যবহারিক পরিবর্তন ঘটিয়ে দলবদ্ধ করার মাধ্যমে পরিযানে উদ্বুদ্ধ করে।

 

যদিও মাইগ্রেটরি লোকাস্টের বিস্তার সবচাইতে বেশি। সবুজ বর্ণের অপরিণত পতঙ্গ পরিণত হবার সঙ্গেই হলুদ বর্ণ ধারণ করে বয়সের সঙ্গে আরও গাঢ় হয় সেই হলুদ। দুটি দশার মধ্যে এতটাই পার্থক্য যে আলাদা প্রজাতি বলেও ভুল হতে পারে। মস্তিষ্কে ঘটে যাওয়া রাসায়নিক পরিবর্তনের সঙ্গে বদল ঘটে চরিত্রের, দলবদ্ধভাবে পরিযান করার সময় রূপান্তরিত হয় নিজের ওজনের সমপরিমাণ খাবারে সক্ষম আগ্রাসী খাদকে। পঙ্গপালের একটি দলে দশ লক্ষ থেকে এক কোটি পতঙ্গ থাকতে পারে। এই সময়ে তিনমাসে এরা সংখ্যা কুড়ি গুন পর্যন্ত বাড়িয়ে নিয়ে প্রতি স্কোয়ার কিলোমিটারে আট কোটি পর্যন্ত হয়। প্রতিটি পতঙ্গের এই সময় দিনে দুই গ্রাম করে খাবার প্রয়োজন। হিসেব করলে দেখা যায় এই পতঙ্গের একটা দল দিনে ৩৫ হাজার লোকের খাদ্যশস্য নষ্ট করে।

 

 

পূর্ব আফ্রিকার মহিলারা চাষের কাজ করেন। আর পুরুষেরা মূলত পশুপালন। পঙ্গপালের আক্রমণের মুখে মহিলারা চিৎকার শুরু করেন। সঙ্গে বাচ্চারা ও পুরুষেরা ড্রাম বাজিয়ে টায়ার জ্বালিয়ে প্রাণপণ চেষ্টা করে তাদের শস্যর খেত থেকে দূরে রাখার। পঙ্গপালের সংখ্যার কাছে প্রায় সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। শিশুরা রাতে পঙ্গপালের আক্রমণের দুঃস্বপ্ন দেখতে থাকে সারা বছর ধরে।

কীটনাশক ছড়িয়ে এদের আক্রমণ আটকানোর চেষ্টায় স্বাস্থ্যজনিত কুপ্রভাবও যথেষ্ট। এদের নিয়ন্ত্রণ করার সবচেয়ে ভালো সময় টা বোধহয় ডিম পাড়ার ঠিক পরপরই। মাটি খুঁড়ে ডিমগুলোকে বাইরে নিয়ে এলে, উষ্ণতায় নষ্ট হবে নয় পাখির খাবার হবে। দলবদ্ধ পঙ্গপাল আটকাতে চাষ জমির চারিপাশে গাঁদা জাতীয় ফুলের চাষ করা যেতে পারে। আকৃষ্ট পতঙ্গরা সেখানে বসলে সহজে কীটনাশক প্রয়োগ করে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

 

দুই হাজার কুড়ি, হর্ন অফ আফ্রিকা থেকে বায়ু প্রবাহের গতি ও দিকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঘণ্টায় প্রায় ১৫ কিলোমিটার উড়ে দেড়শ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করল পরিযায়ী পঙ্গপালের দল। ইয়ামেন ইরান ও পাকিস্তানের উপর দিয়ে রাজস্থান হয়ে ভারতবর্ষে প্রবেশ ও বিস্তার। ঘন জঙ্গল পঙ্গপালের অপছন্দ। পছন্দের খাবার সবুজ শস্য। আর প্রজননের জন্য লোকচক্ষুর আড়াল, শুষ্ক মরুভূমি। ভারতবর্ষের পঙ্গপালের আক্রমণ বজায় থাকার কথা ছিল ২০২১ সাল পর্যন্ত। কিছুদিন আগেই রাজস্থান ও উত্তর প্রদেশ জুড়ে যে পঙ্গপাল ছিল তা মূলত পরিণত। ডিম পাড়ার জন্য তারা আর অগ্রসর না হয়ে পেছনে ফেরে। সেটাও নির্ভর করে বৃষ্টিপাতের উপর। পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট স্থানেই প্রজনন এবং ডিম পাড়ার সম্ভাবনা।

বিগত কয়েক দশকে রাজস্থানের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেড়েছে ক্রমান্বয়ে। বর্ষার সময়ে বোম্বেতে প্রতিমাসে ২০০ মিলিমিটার, চেরাপুঞ্জিতে ৯৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। সেখানে ২০১৮ তে আজমেঢ় অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ২০০ মিলিমিটার। স্বাভাবিকের থেকে ১০০ মিলিমিটার বেশি। রাজস্থানে এই পরিমাণ বৃষ্টি ভবিষ্যতের অশনি সংকেত। বিশ্ব প্রকৃতির উষ্ণায়ন ও বৃষ্টিপাতের বদলে যাওয়া ধারায় পরবর্তী সময়ে আবারও আক্রমণ নামিয়ে আনবে অপরিণত পঙ্গপালের দল। তাদের সর্বগ্রাসী ক্ষিদের সামনে মানুষকে অসহায় হতে হবে।

 

লেখক: অধ্যাপক, প্রাণীবিদ্যা বিভাগ কেশপুর কলেজ

ads

Mailing List