২০২২ সাহিত্যে নোবেল, ফরাসী সাহিত্যিক অ্যানি  আর্নাক্স, তাঁর সাহিত্য ও জীবনবোধ  

২০২২ সাহিত্যে নোবেল, ফরাসী সাহিত্যিক অ্যানি  আর্নাক্স, তাঁর সাহিত্য ও জীবনবোধ   
22 Oct 2022, 11:00 AM

২০২২ সাহিত্যে নোবেল, ফরাসী সাহিত্যিক অ্যানি আর্নাক্স, তাঁর সাহিত্য ও জীবনবোধ

 

. গৌতম সরকার

     

সাম্প্রতিক বছরে সাহিত্যে নোবেল পেলেন ফরাসি ঔপন্যাসিক অ্যানি আর্নাক্স। আর্নাক্সকে পুরস্কৃত করার কারণ হিসেবে সুইডিশ অ্যাকাডেমির বক্তব্য, 'সৎ সাহস ও পর্যবেক্ষণ তীক্ষ্ণতা অবলম্বনে ব্যক্তিগত স্মৃতি, সমষ্টিগত সংযম, বিচ্ছিন্নতা বোধ এবং শিকড় অনাবৃত করার জীবনভোর প্রয়াস তাঁকে এই সম্মানে সম্মানিত করেছে’৷ অ্যাকাডেমির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, 'লিঙ্গ, ভাষা এবং শ্রেণীগত শক্তিশালী বৈষম্য দিয়ে পাক খাওয়া, মানবিক বোধের ঘুন ধরা, মাকড়সার জালে আটকানো শুদ্ধ চেতনা, লোভ, ক্রোধ, অশান্তি, দাঙ্গা, খুন, বলাৎকারে ভরা নিম্নশ্রেণীর মানুষের জীবন ধারাবাহিকভাবে এবং বিভিন্ন আঙ্গিকে আর্নাক্স দেখেছেন, এবং সেই অভিজ্ঞতা বিশ্বস্ততার সাথে তাঁর সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়েছে।' নোবেল সাহিত্য কমিটির চেয়ারম্যান, আন্ডার্স অলসনের মতে, 'আর্নাক্স একজন অত্যন্ত সৎ লেখক, তিনি তাঁর দীর্ঘ সাহিত্য জীবনে কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পান নি। তাঁর সাহিত্যে এমন কিছু বিষয় উপস্থাপন করেছেন যা আগে কেউ করেননি, বা করলেও, দিনের আলোর মত এত স্পষ্ট করে কেউ বলেননি।"

  

বহু লেখকের লেখা পড়ে বড় হয়ে উঠলেও লেখার ক্ষেত্রে তিনি কোনও ঘরানার আশ্রয় নেননি।  আর্নাক্স সারাজীবন একটা 'ফ্ল্যাট স্টাইল' অবলম্বনে সাহিত্যচর্চা করে গেছেন, আর সেটাই তাকে  বিশ্বসাহিত্যে একটা বিশিষ্ট জায়গা দিয়েছে। ১৯৭০ সাল থেকে সাহিত্যচর্চা শুরু করলেও বিশ্বের তামাম পাঠকসমাজে তিনি পরিচিত হলেন ২০১৯ সালে তাঁর বই 'দ্য ইয়ার্স' 'ইন্টারন্যাশনাল বুকার প্রাইজ'-এর জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ে নির্বাচিত হওয়ার পর। নোবেল পুরস্কার জয়ের পর লেখিকার স্বীকারোক্তি, 'সাহিত্য হল লেখকের মতাদর্শ প্রকাশের এক মাধ্যম। সাহিত্য সামাজিক বৈষম্য, অত্যাচার, দুর্নীতি, যন্ত্রনা, শোষণ, অস্পৃশ্যতা, আর্তি, দুর্ভোগ সবকিছুর প্রতি সাধারণ নির্বিরোধী মানুষেরও চোখ খুলে দেয়। আর সেটা সফলভাবে করার জন্য ভাষাকে আমি ছুরির মত ব্যবহার করেছি। যে ছুরি সমাজের কল্পনার পর্দা ছিঁড়ে-খুঁড়ে দেয়।" তাঁর এই বক্তব্যকে সমর্থন করে টাইমস্ পত্রিকার সাহিত্য সমালোচক ডোয়াইট গার্নার বলেছেন, "তাঁর কণ্ঠ আদিম প্রত্যক্ষতার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তিনি সতত একটা ছুরি দিয়ে টেবিলের উপর প্রতিটি বাক্যকে খোদাই করে গেছেন।"

   

১৯৪০ সালে নরম্যান্ডির ছোট্ট শহর ইভেটটে একটি শ্রমজীবী ক্যাথলিক পরিবারে আর্নাক্স জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা-মায়ের একটি মুদিখানা এবং কফি শপ ছিল। বাবা-মায়ের কোনও প্রথাগত শিক্ষা ছিলোনা, বাবা ছিলেন মেজাজি এবং দুর্মুখ। মাত্র বারো বছর বয়সে ছোট্ট বাবাকে তার মাকে হত্যার চেষ্টা করতে দেখেছিলেন। শৈশবের সেই ঘটনা পরবর্তীকালে তাঁর গ্রন্থ 'শ্যেম'-এ উঠে এসেছে, যেখানে তিনি বলছেন, "আমার বাবা জুনের এক রোববার ভোরবেলা আমার মা'কে হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন"৷

     

তাঁর সাহিত্যকর্ম শুরু হয় ১৯৭৪ সালে প্রথম বই 'ক্লিনড আউট' প্রকাশনার মধ্য দিয়ে। বইটির সাফল্য আর্নাক্সকে আরও গভীর সাহিত্যচর্চায় অনুপ্রাণিত করলো৷ এরপর তিনি লিখলেন, 'হোয়াট দে সে গোস' এবং 'দ্য ফ্রোজেন উওম্যান'। বইগুলো কারোর কারোর মতে আত্মজীবনীমূলক, আবার কেউ কেউ দেখেছেন 'সমাজের দর্পণ। লেখিকার নিজস্ব ওয়েবসাইটে উল্লেখ আছে, 'her writing has continued to explore not only her own life experience but also that of her generation, her parents, women, anonymously others encountered in public space, the forgotten.'

   

একটি শ্রমজীবী, আপাত অন্ধকার পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে শৈশব থেকেই ঘরে-বাইরে বিভিন্ন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে অ্যানিকে। বাবার অশিক্ষা এবং বদমেজাজ কখনোই বাবা-মেয়ের সম্পর্কের স্বাভাবিক রসায়ন তৈরি করেনি, মায়েরও রুচি ও সংস্কৃতি তথাকথিত শ্রমিক পরিবারের মহিলাদের মতোই ছিল। শৈশব থেকেই তিনি ফরাসি ক্লাসিক গোগ্রাসে গিলতে শুরু করলেন। আস্তে আস্তে বালজ্যাক, মার্সেস প্রাউস্ট, সিমোন দু বুভোয় পড়ে শেষ করেছিলেন।  ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত হল 'আ ম্যান'স প্লেস'। যেখানে বাবার সাথে তাঁর সম্পর্ক দ্বর্থ্যহীন ভাষায় তুলে ধরেছেন৷ আর্নাক্সের সাথে তাঁর বাবার সম্পর্ক আর পাঁচটা বাবা-মেয়ের সম্পর্কের মত ছিলোনা। এক ভঙ্গুর অথচ পিতাপুত্রীর আত্মিক সম্পর্কের টানাপোড়েন সঠিকভাবে চিত্রিত হয়েছে 'আ ম্যান'স প্লেস' বইটিতে। এই বইটি প্রসঙ্গে নোবেল কমিটির ওয়েবসাইটে লেখা আছে, 'this book was her literary breakthrough and in a scant hundred pages she produced a dispassionate portrait of her father and the entire social milieu that had fundamentally formed him.' আর্নাক্স তাঁর এই উপন্যাস প্রসঙ্গে বলেছেন 'a lived dimension of history, it is dispassionate about the life of a working class man of his time, a struggling grocer with minimal education."

 

 এরপর আর্নাক্স তাঁর মাকে নিয়ে একটি উপন্যাস লিখলেন, নাম দিলেন, 'আ উওম্যান'স স্টোরি'। এই উপন্যাসে তিনি তাঁর মায়ের জীবনের অপ্রাপ্তি ও যন্ত্রণার কাহিনী চিত্রায়িত করেছেন। একজন শ্রমিক মহিলা সংসার চালানোর নিমিত্তে সারাজীবন শুধু পরিশ্রম করেই গেলেন, সুখ-শান্তি-আদর-সোহাগ কাকে বলে জানলেনই না, অতিরিক্ত পরিশ্রমে সময়ের অনেক আগে যৌবন হারিয়ে বৃদ্ধা হয়ে পড়লেন, আর শেষ জীবনে ডিমেনসিয়ায় আক্রান্ত হলেন। আর্নাক্সের উপন্যাসে সন্তানের চোখ দিয়ে এক মায়ের না পাওয়ার যন্ত্রনা শব্দহীন হাহাকার হয়ে ফুটে উঠেছে। মায়ের ডিমেনসিয়া এবং মৃত্যুর পর্যায়ক্রমিক ছবি খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর আরেক বই 'আই রিমেইন ইন ডার্কনেস'-এ। মায়ের মৃত্যু আর্নাক্সের কাছে জীবন-মৃত্যুর সংজ্ঞাটাকেই এলোমেলো করে দিয়েছিল।

    

 আর্নাক্স ফরাসি সংস্কৃতি এবং সমাজের প্রেক্ষাপটে নারী এবং শ্রমিক শ্রেণীর মানুষজনদের দৈনন্দিন জীবনের কথা একের পর এক উপন্যাসে লিখে গেছেন। তিনি সাহিত্যিক সিমোন দু বুভোয়, সমাজ বিজ্ঞানী পিয়েরে বোর্দিউ এবং ১৯৬৮ সালের মে মাসের সামাজিক অভ্যুদ্বয়ের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। নারী এবং সার্বিকভাবে পিছিয়ে পড়া সমাজের বাস্তব চরিত্রকে চিত্রায়িত করতে তাঁর গদ্যকে 'নিষ্ঠুর' এবং সময়ে সময়ে 'অশ্লীল' করতেও দ্বিরুক্তি করেননি।

   

অ্যানি আর্নাক্স দীর্ঘদিন ধরে ডায়েরি লিখে চলেছেন। তার মধ্যে কিছু ডায়েরি ব্যক্তিগত আর কিছু সামাজিক দলিল। তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির আর এক শক্তিশালী মাধ্যম হল এই ডায়েরি। সেই ডায়েরি নিঃসৃত উল্লেখযোগ্য সৃষ্টিগুলি হল, 'আই রিমেইন ইন ডার্কনেস, 'গেটিং লস্ট', 'এক্সটেরিয়রস', 'থিংগস সিন', 'লুক অ্যাট দি প্রিটি লাইটস ডার্লিং', ইত্যাদি। 'দ্য আদার ডটার' শিরোনামে তিনি তাঁর জন্মের আগে মারা যাওয়া বোনের উদ্দেশ্যে একটা চিঠি লিখেছেন। এছাড়া ডায়েরির আরেকটি লেখা, 'হোয়্যার আই বিলঙ' এ তিনি তাঁর নিজের সাথে জন্মস্থান নরম্যান্ডির সম্পর্কের রসায়নের সন্ধান চালিয়েছেন।

    

১৯৯২ সালে 'সিম্পল প্যাশন' বইটি প্রকাশ করে পাঠককুলের কাছে আর্নাক্স একইসাথে সমাদৃত এবং সমালোচিত হন। বিক্ষুব্ধ মহিলা পাঠকদের মতে 'সিম্পল প্যাশন' হল এক বিপথগামী নারীর 'যৌন আকাঙ্খার অকপট চিত্রায়ণ।' আর্নাক্সের যৌনতা নিয়ে কোনও পিউরিটান ছিলোনা, তাই তিনি শুদ্ধ স্বাভাবিক কণ্ঠে বলতে পেরেছেন, "sex had caught up with me, and I saw the thing growing inside me as stigma of social failure."

   

আর্নাক্স বলেছেন, 'আমার জন্য নোবেল পুরস্কার হল লেখা চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও সমাজে নারীরা যে বৈষম্য এবং অপমানের মুখোমুখি হন তার বিরুদ্ধে লড়াই করার অস্ত্র আমার কলম।' তিনি আরও বলেন, 'আমার অবস্থান থেকে একজন নারী হিসেবে কথা বলতে গেলে মনে হয় না যে, আমরা স্বাধীনতার মাপাঙ্কে পুরুষের সমান হয়েছি।' আর্নাক্সের এই পুরস্কার জয়ে তাঁর দেশের বর্তমান প্রেসিডেন্ট এম্মানুয়েল ম্যাক্রোঁর প্রতিক্রিয়া, "Annie Ernaux was the voice of the freedom of women and of the forgotten."

 

সাহিত্য সৃষ্টির শুরুতেই আর্নাক্স বুঝতে পেরেছিলেন, স্কুল-কলেজের পাঠ্য বইয়ে যা পড়ে এসেছেন এবং শিক্ষিকা হিসেবে যা পড়িয়েছেন কিংবা একজন সাহিত্য অনুরাগী হিসেবে যে সমস্ত গল্প উপন্যাস গোগ্রাসে গিলেছেন কোথাও সেভাবে তাঁর নিজের গল্পকে খুঁজে পাননি৷ ছোটবেলায় স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকারা অন্যান্য মেয়েদের দৈনন্দিন জীবনকাহিনী শুনতে আগ্রহী থাকলেও আর্নাক্স নিজের পরিবারের কথা বলতে শুরু করলে তাঁকে থামিয়ে দেওয়া হত। এই ঘটনাগুলোই পরবর্তীতে তাঁকে শ্রমজীবী, খেটে-খাওয়া মানুষের জীবনের টানাপোড়েন, অশান্তি, দাঙ্গা, মানবিক অবক্ষয়, প্রেম, হিংসা, প্রতিশোধ, যন্ত্রণা ইত্যাদি বিষয়গুলি নিয়ে লিখতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। নিজের লেখা সম্বন্ধে বলতে গিয়ে লেখিকা বলেছেন, "the neutral way of writing comes to me naturally, it is the very same style when I wrote home telling my parents the latest news." অন্যদিকে বিখ্যাত সাহিত্যিক ও সমালোচক মার্গারেট ড্র্যাবার তাঁর লেখা সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন,  “Ernaux has inherited de Beauvoir's role of chronicler to a generation. Now the great chronicler been justly rewarded with the greatest of literature prize."

    

সাহিত্যিক হিসেবে দীর্ঘ কঠিন পথ পেরোতে হয়েছে বিরাশি বছর বয়স্কা লেখিকাকে। সেই দীর্ঘ জীবনের দর্শনকে সোজা-সাপ্টা ভাষায় তুলে ধরেছেন অজস্র গল্প-উপন্যাস-ডায়েরির পাতায় পাতায়। লেখার সঙ্গে কখনও কোনোভাবেই সমঝোতা করেননি। পরিবার, সংসার থেকে বেরিয়ে এসে সাহিত্য সৃষ্টিকেই ধ্যান-জ্ঞান-তর্পণ হিসেবে জ্ঞান করেছেন। তাঁর এই সম্মান ইউরোপ, আমেরিকা ছাড়িয়ে তৃতীয় বিশ্বের পাঠকদের কাছেও তাঁকে পরিচিত করে দিল, এটাই সাহিত্য রসিকদের কাছে সবথেকে বড় পাওনা।

 

                                ……………xxx……………

লেখক: অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক

তথ্যঋণ: ইন্টারনেট

Mailing List